দেশের সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাসহ বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর শত শত কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিল বকেয়া পড়ে আছে। একাধিক সিটি করপোরেশন যখন পৌরসভা ছিল, সেই নব্বইয়ের দশক বা একুশ শতকের প্রথম দশকের বকেয়া বিলও এখনো পরিশোধ করা হয়নি।
বিদ্যুৎ বিভাগের বারবার তাগাদার পর এসব প্রতিষ্ঠান ইদানীং চলতি মাসের বিল পরিশোধ করা শুরু করলেও পুরোনো বকেয়া আদায় নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
দেশের উত্তরাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণের কর্তৃপক্ষ নর্দার্ন ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানির (নেসকো) হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাস শেষে তাদের মোট বকেয়ার পরিমাণ ছিল ৬৪৬ কোটি টাকা। এপ্রিল মাসের হিসাব এখনো পাওয়া না গেলেও মার্চ মাসে ৩৩২ কোটি টাকা বিলের বিপরীতে আদায় হয়েছে ৩০৯ কোটি টাকা।
নেসকোর মার্চ মাসের তালিকা অনুযায়ী, রাজশাহীর ৬২টি এবং রংপুরের ২১টি পৌরসভায় বিদ্যুৎ বিল বকেয়া দাঁড়িয়েছে ১২৬ কোটি ১৭ লাখ টাকা। এ ছাড়া রাজশাহী সিটি করপোরেশনে ৪৩ কোটি ৯২ লাখ এবং রংপুর সিটি করপোরেশনে ২৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা বকেয়া জমেছে।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের একজন কর্মকর্তা জানান, তাদের ১৪০ মাসের বিল বকেয়া হয়েছে।
এত টাকা বকেয়া জমার কারণ জানতে চাইলে নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মশিউর রহমান বলেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বছর শেষে অর্থ ছাড় করে বলে একটি বিষয় আছে। এর ফলে নানাভাবে এই বকেয়া জমে যায়।
তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের এই বিল বকেয়া থাকার সমস্যাটি কেবল তাদের একার নয়। দেশের সব বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাই একই ধরনের সমস্যায় ভুগছে।
দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠান যত পুরোনো, বিদ্যুতের বকেয়া বিলের পরিমাণও তত বেশি। ১৯৮৩ সালে যাত্রা শুরু করা ঢাকা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন বর্তমানে দুটি ভাগে বিভক্ত। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কাছে বিদ্যুতের বকেয়া বিল দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০৫ কোটি টাকা, যার বেশিরভাগই পুরোনো বকেয়া। অন্যদিকে, ২০১১ সালে গঠিত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বকেয়া বিলের পরিমাণ প্রায় ১৯ কোটি টাকা।
পুরোনো বকেয়ার বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, এটি বিগত দিনের টাকা। কীভাবে এই বকেয়া জমল তা খতিয়ে দেখতে প্রয়োজনে তদন্ত করা হবে।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর বকেয়া বিদ্যুৎ বিল নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সিটি করপোরেশন-১ শাখার উপসচিব মো. রবিউল ইসলাম। তিনি জানান, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট করপোরেশন বলতে পারবে, মন্ত্রণালয় থেকে তিনি কিছু বলতে পারবেন না।
তবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নগর উন্নয়ন অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব পরিমল সরকার বলেন, এখানে নানা জটিলতা আছে। অনেক সময় প্রতিষ্ঠানগুলো সময়মতো বরাদ্দ পায় না, আবার অনেক সময় তারা কাগজপত্র জমা দেয় না। তবে মন্ত্রণালয় থেকে সব সময় বিল পরিশোধের পরামর্শ দেওয়া হয়। কারণ, এগুলো সরকারেরই এক সংস্থার টাকা যা অন্য সংস্থায় গিয়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ব্যবহার হবে।
রাজশাহীতে ১৪০ মাসের বকেয়া জমার বিষয়ে বিতরণ সংস্থার দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ বিভাগ টাকা পাবে, কিন্তু তারা কেন টাকা চায় না তা তিনি বুঝতে পারছেন না। তিনি আরও জানান, দিন আটেক আগে একটি সমন্বয় সভায় বিলগুলো পরিশোধের তাগাদা দেওয়া হয়েছে এবং আগামী বৈঠকেও বিষয়টি তোলা হবে।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের বকেয়া নিয়ে নেসকোর সার্কেল-১ এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুল আলম বলেন, তিনি শুনেছেন প্রথম থেকেই সেখানে বিল দেওয়া হতো না। এখন প্রতি মাসের চলতি বিল দেওয়া হলেও পুরোনো বকেয়া আটকে আছে, যা প্রায় ১৪০ মাসের মতো।
বেসরকারি খাতে বিল বকেয়া থাকলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রে কেন তেমন পদক্ষেপ নেওয়া হয় না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তারা বিভিন্ন সময় লাইন কেটে দিলেও রাতে স্ট্রিট লাইট বা সড়ক বাতি অন্ধকার রাখা যায় না। এতে নিরাপত্তার সমস্যা দেখা দেওয়ায় দিনে লাইন কেটে আবার রাতের আগেই সংযোগ দিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া দিনে পানির পাম্প চালানোর জন্য জনগণের স্বার্থে সংযোগ চালু রাখতে হয়।
তবে নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, সম্প্রতি রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের সঙ্গে তাদের বৈঠকে সিটি করপোরেশন বকেয়া টাকা ধীরে ধীরে পরিশোধের আশ্বাস দিয়েছে।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, এই বকেয়া অনেক আগের। বর্তমানে তিনি মিটিংয়ে থাকায় বিষয়টি ভালোভাবে জেনে ও বুঝে পরে ব্যাখ্যা দিতে পারবেন।
রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবী চৌধুরী বলেন, বিষয়টি তার কানে এলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এখনো বিস্তারিত জানাননি। ১৮টি দপ্তর থেকে বিস্তারিত তথ্য এলে তিনি তা জানাতে পারবেন।
দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মধ্যে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে (চসিক) বিদ্যুৎ বিল বকেয়া রয়েছে ২৫ কোটি টাকা। চসিকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহমুদ সাফকাত আমিন জানান, দীর্ঘদিনের প্রচলন হিসেবে অর্থবছর সমাপ্তির আগে প্রতি জুন মাসে দেনার একটি বড় অংশ পরিশোধ করা হয়।
সিলেট সিটি করপোরেশনে বকেয়া বিল দাঁড়িয়েছে ১৩ কোটি টাকা। এই করপোরেশনের বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জয়দেব বিশ্বাস বলেন, ২০২৪ সালের আগে বকেয়া ছিল না। এরপর রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় বকেয়া পড়েছে, তবে এখন পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর ৮ কোটি টাকা পরিশোধ করেছেন; বাকি টাকাও পরিশোধ করা হবে।
বরিশাল সিটি করপোরেশনে বকেয়ার পরিমাণ ৬৪ কোটি টাকা, যেখানে ২০০২ সালে সিটি করপোরেশন হওয়ার আগের পৌরসভা আমলের বকেয়াও পরিশোধ করা হয়নি।
খুলনা সিটি করপোরেশনের বকেয়া বিলের বিষয়ে কর্মকর্তারা মন্তব্য করতে রাজি না হয়ে এক বিভাগ অন্য বিভাগে যাওয়ার পরামর্শ দেন। তবে সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শুরুতে তৎকালীন মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক ৬ কোটি ৮০ লাখ ৫৭ হাজার ৯০ টাকার চেক প্রদান করেন। সে সময় করপোরেশনের বকেয়া ছিল ২৬ কোটি ৯ লাখ টাকা।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাছে বকেয়া রয়েছে প্রায় ২৯ কোটি টাকা। ২০১২ সালে গঠিত কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে বকেয়া বিল জমেছে প্রায় তিন কোটি টাকা। কুমিল্লা করপোরেশনের সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, পৌরসভার আমল থেকেই বিদ্যুৎ বিল বাকি রয়েছে। প্রতি মাসে বিল পরিশোধ ও পুনরায় বকেয়া হওয়ার চক্রের মাধ্যমেই এটি চলছে।
জামালপুর পৌরসভায় বিদ্যুতের বকেয়া বিলের পরিমাণ ২ কোটি ৭২ লাখ টাকা। পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ২০০০ সাল থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে এই বিল বকেয়া হয়েছে। বর্তমানে তারা প্রতি মাসের চলতি বিলের সঙ্গে কিছু বাড়তি টাকা যোগ করে বকেয়া পরিশোধ করছেন।
অন্যদিকে, ফেব্রুয়ারি মাস শেষে কিশোরগঞ্জ পৌরসভায় বকেয়া বিল দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ১৩ লাখ ৩১ হাজার টাকা। বিদ্যুৎ বিভাগ মার্চ মাসে পৌরসভা প্রশাসককে চিঠি দিয়ে জানায়, বারবার অনুরোধের পরও বিল পরিশোধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, যা নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।
কেবল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানই নয়, দেশের সরকারি-বেসরকারি নানা সংস্থাও বিদ্যুৎ বিল বকেয়া রেখেছে। দেশের উত্তরাঞ্চলের নীলফামারীর সৈয়দপুর, রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া ও রাজশাহীতে আটকে পড়া পাকিস্তানি ক্যাম্পে বকেয়া বিলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৩ কোটি টাকা।
উত্তরবঙ্গের মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয়ে বকেয়া বিল প্রায় ২৮ কোটি টাকা। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থাপিত মডেল মসজিদগুলোর বিল কারা পরিশোধ করবে তা নিয়ে মসজিদ কমিটি ও সরকারের মধ্যে টানাপড়েন থাকায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিল বকেয়া রয়েছে।
এ ছাড়া উত্তরের সরকারি কোয়ার্টারগুলোতে বকেয়া সাড়ে ৯ কোটি টাকা, পাকশীর নর্থবেঙ্গল পেপার মিলে প্রায় ৫ কোটি টাকা এবং সিরাজগঞ্জ স্পিনিং মিলে বকেয়া বিল প্রায় ৪ কোটি টাকা। বিভিন্ন সেচ পাম্পে বকেয়া ৪১ কোটি টাকার বেশি। এছাড়া ৭ হাজার ৭৪২ জন গ্রাহক প্রায় ৭০ কোটি টাকা বকেয়া রেখে নিখোঁজ বা উধাও হয়ে গেছেন, যা আদায়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে মনে করছেন নেসকোর একজন কর্মকর্তা।
(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন বরিশালের মোফাজ্জল হোসেন, খুলনার আলী আবরার, কিশোরগঞ্জের রকিবুল হাসান রকেল ও জামালপুরের সাইমুম সাব্বির শোভন)


