ইরান-সমর্থিত হুথিদের হামলা থেকে সৌদি আরবকে রক্ষায় ‘যেকোনো উপায়ে’ সহায়তা করার কথা জানিয়েছে পাকিস্তান। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ মঙ্গলবার এ কথা বলেছেন।
তার এ বক্তব্যে চলমান আঞ্চলিক সংঘাতে পাকিস্তানের সরাসরি জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়, ইয়েমেনে ইরানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিমান হামলায় পাকিস্তানি সেনারা ইতোমধ্যে অংশ নিয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলেননি আসিফ। তিনি জানিয়েছেন, সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে নতুন পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা সৌদি আরবের জন্যও ব্যবহারযোগ্য হবে।
রোম সফরকালে আসিফ সাংবাদিকদের বলেন, সৌদি আরবকে রক্ষা করতে যে চুক্তি করেছে পাকিস্তান, তার অর্থ হলো পাকিস্তানের হাতে থাকা যেকোনো পদ্ধতি ব্যবহার করা যাবে সৌদি আরবের জন্যও। তবে পাকিস্তানি বাহিনী কোনো হামলায় অংশ নিয়েছে কিনা, সে বিষয়ে সরাসরি কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি তার বক্তব্যে। এমনকি সৌদি আরব পাকিস্তানের কাছে কোনো সহায়তা চেয়েছে কি না, সেটিও জানাননি তিনি।
সম্প্রতি সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের সেনাপ্রধানদের বৈঠকের কয়েক দিন পর আসিফের এই মন্তব্য এলো। বৈঠকে হুথিদের হামলা মোকাবিলায় করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়।
হুথিরা সম্প্রতি কৌশলগত বন্দরনগরী মোখা ও লোহিত সাগরের কয়েকটি দ্বীপ দখল করেছে। এর ফলে বাব আল-মান্দেব প্রণালির দিকে তাদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ এই সামুদ্রিক পথ দিয়ে চলাচল করে। হুথিরা এবং ইরাকের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সৌদি আরবের তেল স্থাপনাতেও হামলা চালিয়েছে এবং প্রণালিটি দিয়ে সৌদি ট্যাংকার চলাচল ঠেকানোর চেষ্টা করেছে বলে জানান আসিফ।
হুথিদের ‘আগ্রাসী’ আখ্যা দিয়ে সৌদি আরবের প্রতি পাকিস্তানের প্রতিশ্রুতি স্পষ্ট বলে উল্লেখ করেন আসিফ। তিনি বলেন, সৌদি আরবের যে কোনো শত্রু পাকিস্তানেরও শত্রু।
গত ৭ আগস্ট সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করে। চুক্তি অনুযায়ী, সদস্য তিন দেশের যেকোনো একটি আক্রান্ত হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। দেশ তিনটি চুক্তিটিকে প্রতিরক্ষামূলক হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং জানিয়েছে, এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়।
তেলসমৃদ্ধ সৌদি আরব, ন্যাটোর সদস্য তুরস্ক এবং পারমাণবিক অস্ত্রধারী পাকিস্তানকে এই চুক্তি একই প্রতিরক্ষা কাঠামোর আওতায় এনেছে। তবে সৌদি আরবকে সহায়তার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কোনো কথা আসিফ বলেননি।
সৌদি আরব ও হুথিদের চলমান সংঘাত নতুন জোটটির জন্য একটি পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পূর্ণাঙ্গ চুক্তিটি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। এর কমান্ড ও পরিচালনা কাঠামোও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। আসিফ জানান, তিন দেশ একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করছে এবং জোটের কাঠামো তৈরি করছে।
তিনি বলেন, অন্য কয়েকটি দেশ জোটটিতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে এখনই জোট সম্প্রসারণের কোনো পরিকল্পনা নেই।
আঞ্চলিক সংঘাতে ইরান জড়িয়ে পড়ার পর উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলো ব্যর্থ হয়েছে, এমন ধারণা থেকেই নতুন এই জোটের সৃষ্টি। তার মতে, কোনো সংঘাত শুরু হলে তার পরিণতি বা গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
এদিকে ইরানের সঙ্গেও পাকিস্তানের সম্পর্ক বজায় রয়েছে। ইরান দীর্ঘদিন ধরে হুথিদের অস্ত্র ও অন্যান্য সহায়তা দিয়ে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে তেহরান হুথিদের সামরিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার কথা অস্বীকার করে। আসিফের মতে, হুথিসহ ইরাকের কিছু মিত্র মিলিশিয়া এখন স্বাধীনভাবে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারে।
সৌদি আরবকে সামরিকভাবে সহযোগিতার অঙ্গীকারের পাশাপাশি বৃহত্তর ইরান-সংক্রান্ত সংঘাতের অবসানে আলোচনার পক্ষেও পাকিস্তান কাজ করছে বলে জানান আসিফ। একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা করার পক্ষেও পাকিস্তান রয়েছে বলে জানান তিনি।
চলতি বছরের শুরুতে পাকিস্তান আঞ্চলিক কয়েকটি দেশের সঙ্গে মিলে সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পরোক্ষ আলোচনা আবার শুরু হলেও সাম্প্রতিক প্রচেষ্টায় পাকিস্তানের ভূমিকা সম্পর্কে আসিফ বিস্তারিত জানাননি।
গত এপ্রিলে ইসলামাবাদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি আলোচনার আয়োজন করেছিল পাকিস্তান। জুনে দুই দেশ একটি অন্তর্বর্তী চুক্তিতে পৌঁছায় এবং ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা চালানোর প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে পরে আবার সংঘাত শুরু হওয়ায় সেই সময়সীমা পার হয়ে গেছে।
সম্প্রতি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাকে পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের শীর্ষ কূটনীতিকেরাও বৈঠক করেন। সেখানে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি বাস্তবায়ন এবং সৌদি আরবের মক্কাসহ বিভিন্ন স্থানে হামলার বিষয়ে আলোচনা হয়।


