শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে পরিকল্পিতভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনার ধারণা ছিল দুর্নীতিগ্রস্ত সেনাবাহিনীই তার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ। সে লক্ষ্যেই সেনাবাহিনীকে বিভিন্ন জাতীয় প্রকল্পে যুক্ত করে অবৈধ অর্থপ্রবাহের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়।
তিনি জানান, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর সেনাবাহিনীর অফিসারদের মধ্যে ভারত ও আওয়ামী লীগের প্রতি বিদ্বেষ তীব্রতর হয়। এ সময় সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে বিভাজন ব্যাপক আকার ধারণ করে; পেশাদার অফিসারদের সরিয়ে অনুগত অফিসারদের ওপরে নিয়ে আসা হয়।
রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ গুম ও খুনে অভিযুক্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে জবানবন্দি দেন ইকবাল করিম ভূঁইয়া। জিয়ার নিষ্ঠুরতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তার মাথা ইট-পাথরের টুকরো দিয়ে ঠাসা। সে ছিল নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তার সেনানিবাসে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলাম। জবানবন্দি গ্রহণ অসমাপ্ত থাকা অবস্থায় শুনানি সোমবার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে। এর আগে প্রসিকিউশন উদ্বোধনী বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
এই মামলায় প্রসিকিউশনের প্রথম সাক্ষী হিসেবে হাজির হন ইকবাল করিম ভূঁইয়া, যিনি ২০১২ সালের ১৫ জুন থেকে ২০১৫ সালের ২৪ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন। তার জবানবন্দি গ্রহণ অসমাপ্ত অবস্থায় শুনানি সোমবার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে।
গুম ও খুনের সংস্কৃতির বিবর্তন
সেনাবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে গুম ও খুনের সংস্কৃতি কীভাবে গড়ে উঠেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, খুনের সংস্কৃতি নতুন নয় এবং এটি ২০০৮ সাল থেকে শুরু হয়েছে এমন ধারণা ভুল। তার মতে, স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে সেনাবাহিনীকে সেনানিবাসের বাইরে মোতায়েন করা হয়েছে।
কথিত অপরাধীদের সেনাক্যাম্পে এনে জিজ্ঞাসাবাদের সময় নির্যাতনের ফলে কিছু মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, যদিও সংখ্যা সীমিত ছিল। এসব ঘটনা তদন্ত আদালতের মাধ্যমে ও আইন প্রয়োগ করে নিয়মিত করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনা অভিযানের সময়ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, তবে সেগুলো কর্তৃপক্ষের নজরে এলে সংশ্লিষ্টদের শাস্তি দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান। তার ভাষায়, গুমের সংস্কৃতি তুলনামূলকভাবে পরে গড়ে ওঠে।
অভ্যন্তরীণ মোতায়েন ও প্রশিক্ষণের ঝুঁকি
সাবেক সেনাপ্রধান বলেন, সামরিক বাহিনীর মূল দায়িত্ব বহিঃশত্রু থেকে দেশকে রক্ষা করা। তবে পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। দুর্যোগকালীন এবং নির্বাচনকালীনও সেনাবাহিনী মোতায়েন একটি অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। কারণ, সাধারণ ধারণা হলো সেনা মোতায়েন হলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে।
তবে তিনি সতর্ক করেন, সেনাবাহিনীর সদস্যরা প্রাণঘাতী অস্ত্রে সজ্জিত এবং তাদের প্রশিক্ষণ ‘এক গুলি, এক শত্রু’ নীতির ওপর ভিত্তি করে। যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করতে প্রশিক্ষণের সময় তাদের ডিহিউম্যানাইজ করা হয়, মানুষকে ‘টার্গেট’ হিসেবে দেখতে শেখানো হয় এবং মানুষের আদলে তৈরি লক্ষ্যবস্তুর ওপর গুলি চালানো হয়। এই মানসিক কাঠামো নিয়ে বেসামরিক পুলিশিংয়ে যুক্ত করা মারাত্মক ভুল ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।
র্যাব ও বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
২০০৩ সালে র্যাব গঠনকে তিনি মারাত্মক ও ভয়াবহ সিদ্ধান্ত হিসেবে বর্ণনা করেন। তার মতে, সেনা সদস্যদের প্রশিক্ষণ র্যাবের মতো বাহিনীতে কাজের জন্য উপযুক্ত ছিল না। ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটে। র্যাব গঠনের আগেও অপারেশন ক্লিন হার্টে বহু মানুষ মারা যায়। সেনাসূত্রে ১২ জনের মৃত্যুর কথা বলা হলেও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের হিসাব অনুযায়ী সংখ্যাটি ছিল ৬০। পরে ক্লিন হার্টে অংশগ্রহণকারী সবাইকে ইনডেমনিটি দেওয়া হয়, যা কার্যত হত্যার লাইসেন্স ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।
জরুরি অবস্থা ও ডিজিএফআইয়ের উত্থান
তিনি জানান, ২০০৭ সালে নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রধান বিচারপতির বয়স বাড়ানো ইস্যুতে যে সংঘাত শুরু হয়, তার পরিপ্রেক্ষিতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। ২০০৭ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত সময়ে ডিজিএফআই হয়ে উঠে দেশের মুখ্য নিয়ন্ত্রক। বিভিন্ন সময়ে তারা বিভিন্ন ব্যক্তিদের উঠিয়ে এনে তাদের সেলে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করত। এর মধ্যে অনেক মন্ত্রী এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ছিলেন। তারা বিএনপির তারেক রহমানকেও উঠিয়ে এনে নির্যাতন করে।
এই সময় থেকেই যে কাউকে তুলে এনে আটকে রাখা একটি অভ্যাসে পরিণত হয় এবং নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে দায়মুক্তির সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। জরুরি অবস্থায় সেনা সদস্যদের মধ্যে রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন, আধিপত্যবোধ, সিনিয়র-জুনিয়র বিভাজন, নগদ সংস্কৃতির উত্থান এবং অন্ধ আনুগত্যের প্রবণতা সৃষ্টি হয় বলে তিনি জানান।
হাসিনার দ্বিতীয় মেয়াদ ও ‘চারটি চক্র’
শেখ হাসিনা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর তিনি রাষ্ট্র ও প্রশাসনের উপর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন বলে ইকবাল করিম ভূঁইয়ার অভিযোগ। তিনি বলেন, এজন্য সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রাজনৈতিক নেতাদের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করা হয় এবং সংবিধান লঙ্ঘনের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড যুক্ত করা হয়।
তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনা তার আত্মীয় মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিকীকে নিরাপত্তা উপদেষ্টা নিয়োগ দিয়ে সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করেন। তারিক সিদ্দিকী অচিরেই প্রধানমন্ত্রী ও বাহিনীপ্রধানদের মধ্যবর্তী ‘সুপার চিফ’ হয়ে ওঠেন এবং ডিজিএফআই, এনএসআই, র্যাব, এনটিএমসি, আনসার ও বিজিবিকে কার্যত নিয়ন্ত্রণে নেন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, এর মাধ্যমে চারটি চক্র গড়ে ওঠে। যেমন, অপরাধ চক্র, ডিপ স্টেট চক্র, কেনাকাটা চক্র এবং সামরিক প্রকৌশলী চক্র। শেষোক্ত চক্রের মাধ্যমে জাতীয় প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার করে অবৈধ অর্থ উপার্জন করা হতো।
জিয়াউল আহসান ও র্যাব
র্যাবের বিচার বহির্ভূত কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তিনি বলেন, সেনাপ্রধান হওয়ার পরপরই তিনি তৎকালীন এডিজি মুজিবকে ক্রসফায়ার বন্ধের নির্দেশ দেন এবং জিয়াউল আহসানকে নিয়ন্ত্রণে আনতে বলেন। সাময়িকভাবে পত্রিকায় ক্রসফায়ারের খবর কমলেও পরে তিনি বুঝতে পারেন ঘটনাগুলো চাপা দেওয়া হচ্ছে।
বেনজীর আহমেদ র্যাবের ডিজি এবং জিয়াউল আহসান এডিজি হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় বলে তিনি দাবি করেন। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জগলুল আহসান ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজলের কাছে তিনি জানতে পারেন, জিয়াউল আহসান নিয়ন্ত্রণের বাইরে এবং তার মাথা ইট ও পাথরের টুকরো দিয়ে ঠাসা।
জিয়াউল আহসান সেনানিবাসে অস্ত্র, গার্ড ও সিসিটিভি রেখে সামরিক বিধি লঙ্ঘন করছিলেন বলেও তিনি জানান। এক পর্যায়ে তিনি জিয়ার সেনানিবাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে সংঘাত এড়াতে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন।
ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধে অবস্থান
ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, র্যাব, ডিজিএফআই ও বিজিবিতে পোস্টিংয়ের আগে ও পরে কর্মকর্তাদের তার সঙ্গে দেখা করতে হতো। তিনি তাদের বলতেন, নরহত্যা মহাপাপ এবং হাত-পা বেঁধে হত্যা কাপুরুষতা। ফেরত আসা কর্মকর্তাদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা শুনে তিনি সেনাবাহিনীর ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগে পড়েন।
প্রধানমন্ত্রীকে র্যাব সদস্যদের সেনাবাহিনীতে ফিরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী স্বীকার করেছিলেন যে র্যাব রক্ষীবাহিনীর চেয়েও খারাপ, তবে এ বিষয়ে আর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।


