সুপ্রিম কোর্টের জন্য অপ্রতুল বাজেট বরাদ্দ, প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিচারপতি নিয়োগে রাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তা এবং বিচারক সংকটের কারণে পর্যাপ্ত বেঞ্চ গঠন না করার বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে।
একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের পেশাগত মৌলিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। উচ্চ আদালত ও অধস্তন আদালতের ২৬ জন আইনজীবী যৌথভাবে রিট করেন।
বুধবার আইনজীবী মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব জানান, বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমদ ভূঞার হাইকোর্ট বেঞ্চের অনুমতি নিয়ে মঙ্গলবার রিটটি দায়ের করা হয়।
রিটে সংবিধানের ৭, ২১, ২২, ২৭, ৩১, ৩২, ৩৫(৩), ৪৪, ৯৪ ও ১১৬ক অনুচ্ছেদের আলোকে বিচারপ্রাপ্তি এবং ন্যায়বিচার ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। এ জন্য সুপ্রিম কোর্টের প্রয়োজন ও কাজের পরিধি বিবেচনায় পর্যাপ্ত ও আনুপাতিক বাজেট বরাদ্দের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিচারপতি নিয়োগ এবং পর্যাপ্ত বেঞ্চ গঠনের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের জন্য পর্যাপ্ত চেম্বার, বসার জায়গা, স্যানিটেশন, সুপেয় পানি ও ডিজিটাল অবকাঠামো নিশ্চিত করার বিষয়টিও আবেদনে রয়েছে।
প্রধান বিচারপতি ও সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করে বিচার বিভাগের জন্য চাহিদাভিত্তিক ও যুক্তিসংগত বাজেট কাঠামো প্রণয়নের নির্দেশনাও চেয়েছেন রিটকারীরা।
রিটে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, অর্থ বিভাগের সচিব, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল, অ্যাটর্নি জেনারেল, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনকে বিবাদী করা হয়েছে।
আবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সুপ্রিম কোর্টের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৯১ কোটি টাকা। প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেটের তুলনায় এ বরাদ্দ অত্যন্ত কম।
একই অর্থবছরে বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্য ৩৪৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা সুপ্রিম কোর্টের বরাদ্দের চেয়ে প্রায় ৫৬ কোটি টাকা বা ১৯ শতাংশ বেশি। রিটে আরও উল্লেখ করা হয়, আইনমন্ত্রী গত ২ মে গণমাধ্যমে বিচার বিভাগকে রাষ্ট্রের ‘সবচেয়ে অবহেলিত খাত’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
মামলাজট ও বিচারপতির স্বল্পতাকেও রিটে বিচারপ্রক্রিয়ার বড় বাধা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। আবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ ৮৫ হাজার ৮৩০।
এর বিপরীতে আপিল বিভাগে পাঁচজন এবং হাইকোর্ট বিভাগে ৯৯ জনসহ মোট বিচারপতি রয়েছেন ১০৫ জন। ২০২৬ সালের ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত শুধু আপিল বিভাগেই বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল প্রায় ৪২ হাজার।
রিটে বলা হয়, প্রতিবছর দায়ের হওয়া মামলার মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে প্রায় ৩৫ শতাংশ এবং আপিল বিভাগে প্রায় ১৮ শতাংশ নিষ্পত্তি হচ্ছে। বিদ্যমান বিচারক ও অবকাঠামো দিয়ে মামলার চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী অধস্তন আদালতের বিচারকের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার থেকে অন্তত ছয় হাজারে উন্নীত করার উদ্যোগও বাস্তবায়িত হয়নি বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেশি দেশগুলোর সর্বোচ্চ আদালতের তুলনায় বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টে বাজেট বরাদ্দ কম হলেও মামলার চাপ বেশি বলে রিটে দাবি করা হয়েছে।
আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের প্রশাসনিক এবং অবকাঠামোগত ব্যয় একই প্রতিষ্ঠানকে বহন করতে হয়। এ কারণে ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের ওপর কাঠামোগত চাপ বেশি বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে গত ৬ সেপ্টেম্বর বিবাদীদের আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। তিন দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে জবাব দিতে বলা হলেও বিবাদীদের কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি বলে রিটে উল্লেখ করা হয়।


