জঙ্গল সলিমপুর: শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিনের অভিনব প্রতারণা

জঙ্গল সলিমপুর: শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিনের অভিনব প্রতারণা
জঙ্গল সলিমপুর। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে অভিনব এক প্রতারণা ফেঁদেছেন পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন। নিজের কেনা ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির বৈধ দলিল ও কাগজ দেখিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করেছেন সরকারি খাসজমি। ফলে জমি কিনে ঘর তোলা মানুষগুলো জানেনই না যে তারা আসলে সরকারি জমিতে বসবাস করছেন।

জেলা প্রশাসনের হিসাব বলছে, জঙ্গল সলিমপুর মৌজায় সরকারি খাসজমি আছে প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর। দীর্ঘদিন ধরে এসব জমির বিভিন্ন অংশ দখল করে রেখেছিল ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসীরা। এর মধ্যে আলীনগর এলাকাটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখত ইয়াসিন ও তার বাহিনী। গত ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, র‍্যাব, পুলিশ ও বিজিবির প্রায় ৩ হাজার ২০০ সদস্যের যৌথ বাহিনী সেখানে অভিযান চালিয়ে এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। অভিযানের পর ইয়াসিন ও তার লোকজন পালিয়ে আত্মগোপনে চলে যায়।

চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সংযোগ সড়ক ধরে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের বিপরীত পাশে পাহাড়ের ভেতরের রাস্তা দিয়ে জঙ্গল সলিমপুরে ঢুকতে হয়। এই পুরো এলাকাটি মূলত জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর—এই দুই ভাগে বিভক্ত।

অনুসন্ধানে জানা যায়, জঙ্গল সলিমপুর মৌজার (জে.এল. নম্বর ৬৬) ১৯ নম্বর খতিয়ানের ২০১, ২৩৩ ও ২৪১ নম্বর দাগের ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিগুলো ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে কিনেছিলেন ইয়াসিন। পরে ওই জমির বিপরীতে তিনি ১২১২, ১১১৮৬, ১১৩২, ১১০৭ ও ১২৯১ নম্বর নামজারি খতিয়ানও তৈরি করেন। এই বৈধ কাগজগুলোই তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণার হাতিয়ার বানান। ক্রেতাদের বিশ্বাস করিয়ে বলা হতো তাদের ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হতো ২০৩ নম্বর দাগের সরকারি খাসজমি। সেখানে ঘরবাড়ি ও কারখানা গড়ার সুযোগও করে দেওয়া হতো।

কাগজে-কলমে বৈধ জমির মালিক মনে হলেও বাস্তবে এখন তারা সবাই সরকারি খাসজমিতে আটকা পড়েছেন। জমির মালিকানা নিয়ে আছেন চরম অনিশ্চয়তায়।

এই প্রতারণার শিকার হয়েছেন আবদুর রহিম নামের এক ব্যক্তি। ২০১৮ সালে ইয়াসিনের কাছ থেকে ১২ লাখ টাকায় ২১ শতক জমি কিনেছিলেন তিনি। কিন্তু তাকে পুরো জমি বুঝিয়ে না দিয়ে শুধু ২০৩ নম্বর দাগের সরকারি খাসজমি ভোগ করতে বলা হয় এবং পরে দলিল দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০২৬ সালে এসে তাকে ২০১ নম্বর দাগ থেকে মাত্র এক শতকের একটি দলিল ধরিয়ে দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন

একইভাবে আরমান নামের আরেক ব্যক্তিকে ২০১২ সালে ২০৩ নম্বর দাগের সরকারি জমি ভোগ করতে দেওয়া হলেও, ২০২৬ সালে তাকেও ২০১ নম্বর দাগ থেকে চার শতকের একটি দলিল দেওয়া হয়।

ভুক্তভোগী ক্রেতারা জানান, জমি রেজিস্ট্রি করার সময় চট্টগ্রাম আদালতের এনেক্স ভবনে এক আইনজীবীর কাছে নিয়ে তাদের শুধু কাগজে সই করিয়ে নেওয়া হতো। নিজের চোখে দলিল পড়ার বা দেখার কোনো সুযোগ তাদের দেওয়া হতো না। এছাড়া জমির আসল অবস্থান ঠিক রাখতে এবং ভবিষ্যতের আইনি ঝামেলা এড়াতে দলিলের চৌহদ্দি বা সীমানার বিবরণ সঠিক থাকা জরুরি হলেও, এই ক্ষেত্রেও বড় ধরনের জালিয়াতি করা হয়।

কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, ২০২৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ও ১ অক্টোবর ইয়াসিন মোট ৭৪টি দলিলের মাধ্যমে এই জমি হস্তান্তরের কাজ করেন। এর মধ্যে ২০১ নম্বর দাগে ৬৬টি দলিলের মাধ্যমে ২৪৬ দশমিক ৭৫ শতক জমি, ২৩৩ নম্বর দাগে ৭টি দলিলের মাধ্যমে ২৭ শতক এবং ২৪১ নম্বর দাগে ১টি দলিলের মাধ্যমে ১ শতক জমি হস্তান্তরের তথ্য দেখানো হয়েছে। এই ৭৪টি দলিলের মধ্যে ২৭টিতে মাত্র ১ শতক করে এবং ১৩টিতে ২ শতক করে জমি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির কাগজ সামনে রেখে মানুষকে সরকারি জমিতে বসতি গড়তে বাধ্য করা এবং জমি বিক্রির নামে এই প্রতারণা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। এর ফলে সাধারণ মানুষ যেমন সর্বস্বান্ত হচ্ছেন, তেমনি তাদের বসতি ও ভবিষ্যৎও চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম টাইমস’কে বলেন, সরকার জঙ্গল সলিমপুরের সাধারণ মানুষের বিপক্ষে নয়। তাই ইয়াসিনের কোনো ফাঁদে পা দিয়ে যেন কেউ প্রতারিত না হন।

পুলিশ সুপার আরও জানান, এই এলাকায় একটি আধুনিক ও নিরাপদ উপশহর গড়ে তুলতে সরকার একটি মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এতে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে এবং স্থানীয়দের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করলে বৈধ উপায়ে এখানে বসবাসের সুব্যবস্থাও করা হবে, অন্যথায় সবাইকে সবকিছু হারাতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad