নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর দেওটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে জমির নামজারি করতে ঘুষ দাবির অভিযোগ উঠেছে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা জয়নাল আবেদিনের বিরুদ্ধে।
দাবি করা টাকার চেয়ে এক হাজার টাকা কম দেওয়ায় এক নারী সেবাগ্রহীতার সঙ্গে দেনদরবারের একটি ভিডিও টাইমস অব বাংলাদেশের হাতে এসেছে। ভিডিওতে ওই নারীকে চড়া সুদে টাকা ধার করে আনার কথা বলতে শোনা গেছে।
ভিডিওতে ওই নারী বলেন, ‘সুদে টেঁয়া লই কাম ইয়ান করি আটকি গেছি। অন আঁত্তুন ওগগা হাজার টেঁয়া কম নেন। আননে নয় হাজার টেঁয়া চাইছেন, আঁই আন্নেরে আস্টে হাজার টেঁয়া দিছি।’
অর্থাৎ, নয় হাজার টাকা দাবি করা হলেও তিনি চড়া সুদে আট হাজার টাকা সংগ্রহ করে এনেছেন এবং এক হাজার টাকা কম নেওয়ার অনুরোধ করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, কয়েকদিন ধরে নিজের জমির নামজারি করতে দেওটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গিয়ে বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হন ওই নারী। পরে কথিত ঘুষের টাকা দিতে তিনি অফিসে হাজির হন। তবে দাবি করা নয় হাজার টাকার পরিবর্তে আট হাজার টাকা দেওয়ায় বিষয়টি নিয়ে দেনদরবার হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দেওটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দালালদের দৌরাত্ম্য ও সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি দীর্ঘদিনের। সরকারি নির্ধারিত ফি দিয়ে সেবা নিতে গেলে নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করা হয়। পরে দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা দিলে কাজ সহজে সম্পন্ন হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা জয়নাল আবেদিনকে কেন্দ্র করে একটি দালালচক্র সক্রিয় রয়েছে। ওই চক্রে পাঁচ থেকে সাতজন দালাল রয়েছেন বলে অভিযোগ। তাদের মধ্যে মতিউল ইসলাম শামিম ও সাহাদাত হোসেনের নাম স্থানীয়ভাবে আলোচিত।
এ ছাড়া, জয়নাল আবেদিনের ছেলে নাইম হোসেনও কোনো সরকারি নিয়োগ ছাড়াই বাবার সঙ্গে ভূমি অফিসে বসে কাজ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে সরকারি নির্ধারিত ফি’র বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
ভূমি অফিস থেকে নাগরিকদের ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান, নামজারি ও মিউটেশন আবেদন যাচাই ও তদন্ত, বিভিন্ন ধরনের খতিয়ান সংরক্ষণ ও হালনাগাদ, খাসজমি বন্দোবস্তের তালিকা ও প্রস্তাব তৈরি এবং জমির সীমানা ও মালিকানা-সংক্রান্ত বিরোধের প্রাথমিক তদন্তসহ বিভিন্ন সেবা দেওয়া হয়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ই-নামজারির জন্য ১ হাজার ১৭০ টাকা, খতিয়ানের অনলাইন বা সার্টিফাইড কপির জন্য ১২০ টাকা, মৌজা ম্যাপের প্রতি শিটের জন্য ৫৪৫ টাকা এবং খতিয়ান সংশোধন আবেদনের জন্য ২০ টাকা ফি নির্ধারিত রয়েছে।
তবে স্থানীয় সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, নির্ধারিত সরকারি ফি দিয়ে সহজে এসব সেবা পাওয়া যায় না। অতিরিক্ত অর্থ না দিলে দিনের পর দিন ভূমি অফিসে ঘুরতে হয়। একপর্যায়ে অনেকে বাধ্য হয়ে দালালের মাধ্যমে কাজ করান।
ঘুষের টাকা নিয়ে দেনদরবারের ভিডিওটির বিষয়ে জানতে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা জয়নাল আবেদিনের সঙ্গে কথা বলা হলে তিনি ভিডিওটির সত্যতা স্বীকার করেন।
তিনি টাইমসকে বলেন, ‘আমি সবাইকে বলি আমাকে কাজ দিয়েন না, আমি বয়স্ক মানুষ। মাফ চাই, আমি নিজের জন্য টাকা নেই না। কাজ না হলে ওই নারীর টাকা ফিরিয়ে দেব।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই টাকা উপজেলা ভূমি অফিসকে ভাগ করে দিতে হয়। সবাই ভাগ পায়। টাকা ছাড়া কাজ নিয়ে গেলে বলে বিনা পয়সার কাম কিল্লাই আনছেন! মক্কেল পাঠায় দেন।’
কারা এই টাকা নেন–এমন প্রশ্নের জবাবে জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘দেওটি তহসিল অফিস মেইনটেইন করে আনোয়ার, এভাবে নাজমুল, ফরহাদসহ প্রত্যেকে আলাদা আলাদা তহসিল অফিস মেইনটেইন করেন।’
নির্ধারিত টাকা দিতে না পারলে সেবাগ্রহীতাদের অবিশ্বাস করা হয় এবং তাদের উপজেলা ভূমি অফিসে নিয়ে যেতে বলা হয় বলেও দাবি করেন তিনি।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কত টাকা পান–এমন প্রশ্নের জবাবে জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘আমার হাত-পা বাঁধা। তবে এটুকু বলি, সবাই ভাগ পায়।’
এ বিষয়ে সোনাইমুড়ী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জসিম উদ্দিন টাইমসকে বলেন, ‘লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’


