‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬’-এর থিমেটিক সেশনের আলোচনায় উঠে এসেছে দুর্নীতির অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ, যেখানে বলা হয় দুর্নীতি এখন আর শুধু স্থানীয় ইস্যু নয় বরং একটি সুসংগঠিত বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক।
সম্পাদক, অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও মিডিয়া প্রশিক্ষকদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই সেশনে দুর্নীতি উন্মোচনের কৌশল, ঝুঁকি এবং প্রযুক্তিনির্ভর নতুন সাংবাদিকতার বাস্তবতা তুলে ধরা হয়।
আলোচনায় সঞ্চালক হিসেবে ছিলেন সাবেক বিবিসি সাংবাদিক শাকিল আনোয়ার, যিনি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কাঠামো ও সম্পাদকীয় স্বাধীনতার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা পরিচালনা করেন।
কানাডার অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা জুলিয়ান শের বলেন, ‘দুর্নীতি কোনো দেশের সীমায় আটকে নেই এটি একটি গ্লোবাল সিস্টেম।’
তিনি বলেন, ‘অর্থ ও প্রভাব আন্তর্জাতিকভাবে স্থানান্তরিত হওয়ায় সাংবাদিকদেরও একইভাবে সীমান্ত পেরিয়ে সহযোগিতামূলক অনুসন্ধান চালাতে হবে।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘দুর্নীতি অনুসন্ধান ঝুঁকিপূর্ণ কাজ, কারণ এটি শক্তিশালী স্বার্থগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।’
তিনি বাংলাদেশ ও কানাডার উদাহরণ টেনে বলেন, ‘বড় কর্পোরেট দুর্নীতি ও বৈশ্বিক প্রকল্পগুলোতে একাধিক দেশের আর্থিক ও রাজনৈতিক জটিলতা জড়িত থাকে।দুর্নীতি এখন বৈশ্বিক তাই তদন্তও হতে হবে বৈশ্বিক।’
বাংলাদেশ ও কানাডার সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে দুর্নীতির একটি দুঃখজনক ইতিহাস রয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সূচকে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় থাকলেও কানাডার অবস্থান তুলনামূলকভাবে ভালো হলেও সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।’
তিনি ২০১২ সালের পদ্মা সেতু দুর্নীতি কেলেঙ্কারির প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘একটি বড় কানাডীয় কোম্পানির বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি বাতিল করে এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে বিভিন্ন কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ করা হয়।’
এছাড়াও ২০১৩ সালের রানা প্লাজা ধসের পর তার অনুসন্ধানী দল “দ্য ফিফথ এস্টেট” বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান করে জানায়, দুর্ঘটনার পেছনে কানাডীয় অর্থায়ন ও কোম্পানির ভূমিকা ছিল এবং শ্রমিক শোষণের সঙ্গেও তাদের সংশ্লিষ্টতা প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।
দৈনিক সমকালের সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী বলেন, “বড় দুর্নীতির অনুসন্ধান একা করা প্রায় অসম্ভব। দুর্নীতি একটি নেটওয়ার্ক ও সংস্কৃতি তাই সাংবাদিকদেরও একইভাবে নেটওয়ার্কভিত্তিক সহযোগিতায় কাজ করতে হবে।”
তিনি বলেন, ‘রিপোর্ট প্রকাশের ক্ষেত্রে সময় নির্বাচন (টাইমিং) এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভুল সময়ে বড় অনুসন্ধান প্রকাশ করলে সেটির প্রভাব কমে যেতে পারে, তাই সাংবাদিকদের কৌশলগতভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।’
মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) এর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক বিচার হেল্প ডেস্কের প্রধান বাদিউজ্জামান বাবু অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, ‘দুর্নীতি অনুসন্ধানে যুক্ত সাংবাদিকদের নানা ধরনের ঝুঁকি ও চাপ মোকাবিলা করতে হয়, তাই প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা অপরিহার্য।’
তিনি আর বলেন, ‘দুর্নীতি এখন শুধু স্থানীয় সমস্যা নয়, বরং একটি বৈশ্বিক কাঠামো। তাই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকেও হতে হবে সমন্বিত, ডেটা-নির্ভর এবং ঝুঁকি-সচেতন।’
ডেইলি স্টারের সিনিয়র রিপোর্টার জাইমা ইসলাম অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার রূপান্তর নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন, ‘আগের সোর্স-নির্ভর সাংবাদিকতা এখন ধীরে ধীরে ডেটা-ড্রিভেন ইনভেস্টিগেশনে রূপ নিচ্ছে।’
তিনি প্রকিউরমেন্ট ডেটা, কাস্টমস রেকর্ড এবং এইচএস কোড বিশ্লেষণের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় নজরদারি প্রযুক্তি ও আমদানি-নেটওয়ার্ক উন্মোচনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ‘প্রায় ৭০ হাজার ডেটা এন্ট্রি বিশ্লেষণ করে একটি পূর্ণ নজরদারি অবকাঠামোর চিত্র উন্মোচন করা সম্ভব হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন ট্র্যাকিং ও মনিটরিং প্রযুক্তি লিগ্যাল ইন্টারসেপশন সিস্টেম-এর নামে আনা হচ্ছে, যা গোপনে আড়িপাতার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।’
বক্তারা বলেন, দুর্নীতি এখন বৈশ্বিক ও জটিল নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। তাই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকেও হতে হবে সহযোগিতামূলক, ডেটা-নির্ভর এবং কৌশলগতভাবে পরিকল্পিত।এ ধরনের আলোচনা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মানোন্নয়ন এবং দুর্নীতিবিরোধী প্রতিবেদনকে আরও কার্যকর ও প্রভাবশালী করে তুলবে।


