সাড়া জাগাতে ব্যর্থ হচ্ছে সর্বজনীন পেনশন স্কিম। ৬০ বছরের বেশি বয়সী সবার জন্য পেনশন চালুর সরকারি প্রকল্প অনেকটাই মুখ থুবড়ে পড়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগের বছর যে প্রকল্প নিয়ে সবাই উচ্ছ্বসিত ছিল, তিন বছর পরে এসেও প্রকল্পে নিবন্ধিতদের সংখ্যা একই জায়গায় থমকে আছে। আর যারা এরই মধ্যে নিবন্ধন করছেন তাদেরও একটি বড় অংশ কিস্তির টাকা জমা দিচ্ছেন না।
এপ্রিলের শেষ সপ্তাহের তথ্য অনুযায়ী, সর্বজনীন পেনশন স্কিমে তিন লাখ ৭৭ হাজার ৫২৪ জন নিবন্ধিত হয়েছেন। তাদের সিংহভাগই প্রকল্প চালুর প্রথম এক বছরে তালিকাভুক্ত হন।
২০২৪ সালের ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত নিবন্ধিত ছিলেন তিন লাখ ৭২ হাজার ১৫৫ জন।
বিএনপি সরকারে আসার পরদিন অর্থাৎ গত ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্কিমে নিবন্ধনের সংখ্যা ছিল তিন লাখ ৭৩ হাজার ৩০৮ জন।
এই পরিসংখ্যান বলছে, সালের ৮ আগস্ট থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে কেবল হাজারখানেক মানুষ পেনশন প্রকল্পে নাম তালিকাভুক্ত করেছে। বিএনপি সরকারে আসার পর সেই গতি কিছুটা বাড়লেও তা প্রত্যাশিত মাত্রার ধারে কাছেও নেই।
অথচ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে চার কোটি পরিবারের অন্তত একজন সদস্যকে এই পেনশনের আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে এই পেনশনে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হবে। তখন সরকারি চাকরিজীবীদের জন্যও আলাদা পেনশন ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়া হবে।
অবশ্য নাম নিবন্ধন করা মানেই যে সবাই নিয়মিত চাঁদা বা কিস্তি জমা দিচ্ছে তা নয়।
সিলেটের সাংবাদিক ও লেখক কবির য়াহমদ চৌধুরী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমি তো এই প্রকল্পকে একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ মনে করেই নিবন্ধন করেছিলাম। ভেবেছিলাম, প্রকল্পে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি এর প্রচারণাতেও অংশ নেব। সে সময় মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে লেখালেখিও করেছি। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাইয়ের পরে আর কিস্তি দেইনি।’
সেটি কেন? – এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘স্কিমটি সে সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিরোধিতার মুখে পড়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার যেভাবে আগের সরকারের সব প্রকল্পর সমালোচনা করছিল, তখন আমার অনাস্থা আরও বাড়ে।’
অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, তারা পেনশন স্কিমকে আরও আকর্ষণীয় করতে উদ্যোগ নেবেন। তবে প্রকৃতপক্ষে এই খাতে তেমন অগ্রগতি হয়নি।
কবির আহমদ বলেন, ‘যেখানে আর্থিক বিষয় জড়িত, সেখানে মানুষ আস্থা খোঁজে। বর্তমান সরকার ঘোষণা দিক এটি একটি অর্থনৈতিক কর্মসূচি, তাহলে আমি আবার বকেয়া শোধ করে কিস্তি নিয়মিত করব।’
সর্বজনীন পেনশন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সুরাতুজ্জামান জানান, বর্তমানে প্রায় ৪০ শতাংশ গ্রাহক কিস্তি জমা দিচ্ছেন না। এই পরিস্থিতিতে সাময়িক দাবি করে তিনি বলেন, ‘আস্থা ফিরলে জনগণের অংশগ্রহণ আবার বাড়বে বলে আমাদের আশা।’
কর্তৃপক্ষ সর্বজনীন পেনশন স্কিমকে সফল করতে বেশ কিছু সংস্কার উদ্যোগ হাতে নিয়েছে বলেও জানান তিনি। এর মধ্যে রয়েছে ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক স্কিম চালুর, পাঁচ বছর পর জমার ৩০ শতাংশ উত্তোলনের সুযোগ (গ্র্যাচুইটি সুবিধা), বেসরকারি শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্তি এবং প্রবাসী স্কিমকে আরও আকর্ষণীয় করা।
এসব কার্যক্রম চাঙ্গা করতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা এডিবি’র কাছ থেকে ১০ কোটি ডলার ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছে সরকার। এই অর্থে পেনশন ব্যবস্থার প্রশাসনিক আধুনিকায়ন, আইটি অবকাঠামো শক্তিশালী করা এবং এই বিশাল তহবিল পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল তৈরি করা হবে।
বর্তমানে পেনশনের জমার টাকা সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়। বিনিয়োগের আরও নতুন কী খাত তৈরি করা যায়, সে বিষয়ে পরামর্শক নিয়োগের কথাও ভাবছে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ।
নিবন্ধনকারীদের সিংহভাগই নিম্ন আয়ের
স্কিমে নিবন্ধনকারীদের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বেশিরভাগই মধ্যে ও নিম্ন আয়ের মানুষ, যাদের কিস্তির অর্ধেক সরকার পরিশোধ করে।
যারা তালিকাভুক্ত হয়েছেন, তাদের মধ্যে নিন্ম আয়ের মানুষদের ‘সমতা’ স্কিমেই আছেন দুই লাখ ৮৭ হাজারের কাছাকাছি। এই ক্যাটাগরিতে নিবন্ধিতরা মাসে সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা জমাতে পারেন। যার মধ্যে ৫০০ টাকা নিবন্ধনকারী ও বাকি ৫০০ টাকা দেয় সরকার।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রায় ৬৫ হাজার নিবন্ধনকারী বেছে নিয়েছেন স্বকর্ম ও অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মীদের জন্য করা ‘সুরক্ষা’ স্কিম। এই স্কিমে সর্বনিম্ন এক হাজার থেকে মাসে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জমানো যায়।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য আনা ‘প্রগতি’ স্কিমে নিবন্ধনের সংখ্যা ২৫ হাজার টাকার কাছাকাছি। শুরুতে এই স্কিমে মাসে এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জমানোর সুযোগ ছিল। এখন সর্বোচ্চ জমার পরিমাণ বাড়িয়ে ১৫ হাজার টাকা করা হয়েছে।
প্রবাসীদের জন্য ‘প্রবাস’ স্কিমে এক হাজারের কিছু বেশি মানুষ নিবন্ধন করেছেন। শুরুতে এই স্কিমে মাসে পাঁচ অথবা ১০ হাজার টাকা জমানো যেত। তবে এখন এই স্কিমে একজন প্রবাসী এক হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জমাতে পারবেন।
সর্বজনীন পেনশন কর্তৃপক্ষের একজন কর্মকর্তা টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, এপ্রিল শেষে জমার পরিমাণ প্রায় ২৫৪ কোটি টাকা। বিএনপি সরকার ক্ষমতা নেওয়ার আগে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি জমার পরিমাণ ছিল ১৫৮ কোটি টাকার কাছাকাছি।
অর্থনীতিবিদ মাসরুর রিয়াজ এই পরিসংখ্যানকে হতাশাজনক উল্লেখ করে টাইমসকে বলেন, ‘উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি,ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মানুষের সঞ্চয় সক্ষমতা কমে গেছে, যা সরাসরি পেনশন স্কিমে বিনিয়োগে প্রভাব ফেলছে। পাশাপাশি গত দুই বছরে স্কিমটির সুবিধা ও কার্যকারিতা নিয়ে পর্যাপ্ত প্রচারণার অভাবও একটি বড় কারণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক গোষ্ঠী—যেমন তৈরি পোশাক শিল্প বা রপ্তানি খাতের কর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করতে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ না থাকায় স্কিমটির বিস্তার সীমিত রয়েছে।’
গণযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ গোলাম রহমান বলেন, ‘সর্বজনীন পেনশন একটি ভালো উদ্যোগ হলেও এটি সরকারি অগ্রাধিকার পাচ্ছে না। ২০২৩ সালে চালুর সময় যেভাবে প্রচার করা হয়েছিল, এখন সেই ধারাবাহিকতা আর দেখা যাচ্ছে না। ফলে মানুষের আগ্রহও ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।’
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সুরাতুজ্জামান বলেন, ‘নতুন এই ব্যবস্থাটি সম্পর্কে শুরুতে মানুষের পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় গ্রহণযোগ্যতা কম ছিল। নতুন কোনো প্রযুক্তি বা ব্যবস্থার মতোই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই স্কিমের প্রতি আস্থা তৈরি হবে এবং অংশগ্রহণ বাড়বে।’
চাঁদার মেয়াদ যত বেশি, পেনশনের অঙ্কও তত বড়
বর্তমানে ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী সব বাংলাদেশি নাগরিক জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে এই স্কিমে অংশ নিতে পারেন। বিশেষ বিবেচনায় ৫০ বছরের বেশি বয়সীরাও এতে যুক্ত হতে পারেন, তবে সেক্ষেত্রে কমপক্ষে ১০ বছর নিয়মিত চাঁদা প্রদান করতে হয়। প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্যও স্কিমটি উন্মুক্ত, যেখানে বৈদেশিক মুদ্রায় পাঠানো চাঁদার ওপর ২দশমিক ৫ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হয়।
এই স্কিমে অংশগ্রহণকারীরা যে কোনো সময় ওয়েবসাইটে ঢুকে তার জমাকৃত টাকা, প্রতি বছর আসা মুনাফা কত তা দেখতে পারেন। তাদের বয়স ৬০ বছর হয়ে যাওয়ার পর জমাকৃত টাকার ওপর নির্ভর করে তারা পেনশন পেতে থাকবেন। অর্থ উত্তোলনের জন্য এতে নতুন আবেদন করার কোনো প্রয়োজন নেই, স্বয়ংক্রিয়ভাবে টাকা জমা হয়ে যাবে।
একজন ব্যক্তি যত বেশি সময় টাকা জমা করবেন, তারা পেনশনও তত বেশি হবে। যেমন ১৮ বছর বয়সী কেউ যদি মাসে দুই হাজার টাকা জমা করেন, তাহলে তার পেনশন হবে ৬৮ হাজার ৯৩১ টাকা। কিন্তু কেউ যদি মাসে ১০ হাজার টাকা করে ১০ বছর টাকা জমান, তাহলে তার পেনশন হবে ১৫ হাজার ৩০২ টাকা।
যার নামে পেনশন হবে, তিনি আজীবন টাকা পেয়ে যাবেন, তিনি কমপক্ষে ১৫ বছর পেনশন পেলে নমিনি কোনো টাকা পাবেন না। আর ১০ বছর পেনশন পাওয়ার আগে মারা গেলে নমিনি বাকি ৫ বছর অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন।
তবে এখানে বিমার কোনো সুবিধা রাখা হয়নি। ফলে কিস্তিদাতা ৫৯ বছর বয়সে মারা গেলে নমিনি কেবল জমা করা টাকা আর লভ্যাংশ পাবেন, কোনো পেনশন পাবেন না।
অর্থনীতিবিদ মাশরুর রিয়াজ মনে করেন, সরকারি পেনশনে যেহেতু স্বামী বা স্ত্রী মারা গেলে তার জীবনসঙ্গী আজীবন পেনশন পেয়ে থাকেন, তাই সর্বজনীন পেনশনেও এই ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘একই পরিবারে স্বামী ও স্ত্রী এই পেনশন স্কিম নেওয়ার সম্ভাবনা কম। যদি এটা করা না হয়, তাহলে প্রবীণ বয়সে নমিনি আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়তে পারেন।’


