দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে সংকটের মুখে পড়েছে পিরোজপুরের নেছারাবাদে গড়ে ওঠা জাহাজ নির্মাণ শিল্প। সঠিক পরিকল্পনার অভাবে এখন ঝুঁকির মধ্যে এই উপজেলার প্রায় অর্ধশত ডকইয়ার্ড।
অথচ অপার সম্ভাবনা নিয়ে এখানে শুরু হয় এই শিল্পখাত। আধুনিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই ডকইয়ার্ডগুলোতে আন্তর্জাতিক মানের জাহাজ তৈরি করা সম্ভব। সরকারি সঠিক উদ্যোগ এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে এখানে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
নদীমাতৃক জেলা পিরোজপুর এক ডজন নদী এবং ৭টি উপজেলা নিয়ে গঠিত। এই জেলার মধ্যে ব্যবসায়িকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা সন্ধ্যা নদীর দুই পাড়। গত দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে নেছারাবাদ উপজেলার সন্ধ্যা নদীর তীরে অসংখ্য ডকইয়ার্ড গড়ে ওঠে।
এখানে জাহাজ নির্মাণ খরচ তুলনামূলক কম। এই কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ নতুন জাহাজ তৈরি এবং পুরনো জাহাজ মেরামতের জন্য এখানে আসেন। এই ডকইয়ার্ডগুলোকে কেন্দ্র করে বর্তমানে প্রায় কয়েক হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। নেছারাবাদ ছাড়াও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন এলাকার শ্রমিকরা কাজের সন্ধানে নিয়মিত এখানে ছুটে আসেন।
তবে এই বিপুল কর্মযজ্ঞের মধ্যেও রয়েছে জীবনের ঝুঁকি। ডকইয়ার্ডগুলোতে শ্রমিকরা কোনো প্রকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই কাজ করেন। নিরাপত্তাহীনভাবে কাজ করার ফলে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। এতে শ্রমিকরা যেমন আহত হচ্ছেন, তেমনি মাঝে মাঝে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। কাজ করার সময় প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম না থাকায় শ্রমিকরা বিভিন্ন ধরণের শারীরিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।
ছারছিনা ডকইয়ার্ডের শ্রমিক সিরাজুল ইসলাম জানান, তিনি গত ৪ বছর ধরে এখানে কাজ করছেন। আগে তিনি ঢাকার নারায়ণগঞ্জে কাজ করতেন। তিনি জানান, পিরোজপুরে ছোট-বড় প্রায় অর্ধশত ডকইয়ার্ডে বর্তমানে ৮ থেকে ১০ হাজার শ্রমিক কাজ করছেন। তারা ছোট ও বড় অনেক ধরণের জাহাজ তৈরি করেন। কিন্তু তাদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই।
সিরাজুল ইসলাম মনে করেন, সরকারিভাবে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে তারা আন্তর্জাতিক মানের জাহাজ নির্মাণ করতে পারতেন। এতে প্রশিক্ষিত শ্রমিকরা বিদেশে গিয়েও কাজ করার সুযোগ পেতেন।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এখানে শ্রমিকদের নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা নেই। এর আগে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে দুইজন শ্রমিক মারা গিয়েছেন। সরকারি প্রশিক্ষণ আর পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে এই খাতে আরও হাজারও মানুষের কর্মসংস্থান হতো।
এই শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিসিকের উপব্যবস্থাপক এইচ এম ফাইজুর রহমান আশার কথা শুনিয়েছেন। তিনি জানান, বিসিক এসব ডকইয়ার্ডের শ্রমিকদের উন্নত মানের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যাপারে তৎপর রয়েছে। একই সাথে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ দেওয়ার বিষয়েও তারা কাজ করছেন।
তবে তিনি মনে করেন, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে এলে এই শিল্পের দ্রুত প্রসার ঘটবে। যথাযথ গুরুত্ব পেলে দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারবে এই শিল্প।


