ডাম্বুলায় শ্রীলংকার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচ। ইনিংসের ১৩-তম ওভার, চামিকা করুনারত্নের অফস্টাম্পের বাইরের বলে পয়েন্টের পেছন দিয়ে শামীম হোসেনের দারুণ এক কাট। একই ওভারের শেষ বল, করুনারত্নের অফ কাটারে একই স্টাইলে আরো একটা কাট বাঁহাতি শামীমের। দুটো শটের ফলাফলই চার।
৪ ওভার এগিয়ে যাওয়া যাক। অফ স্টাম্প লাইনে স্লিংগিং অ্যাকশনের নুয়ান থুসারার ফুল লেংথ বল। বলের লাইনে গিয়ে হাই এলবোতে ফ্রন্ট ফুটে শামীম তুলে মারলেন লং অফে। যতক্ষণ না বলটা বাউন্ডারির পেরিয়েছে, ততক্ষণ ফলো থ্রুতে ব্যাটটা ধরেই দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। ফটোগ্রাফারদের জন্যও দারুণ এক ছবি ছিল সেটা।
সেই ইনিংসে শামীম করেছেন ২৭ বলে করেছেন মহামূল্যবান ৪৮* রান। ছিল পাঁচটা চার আর দুটা ছক্কা। পাঁচ চারের চারটিই মেরেছেন অফ সাইড রিজিওনে; পয়েন্ট, ডিপ পয়েন্ট, এক্সট্রা কভার আর থার্ড ম্যানে। লং অফে প্রথম ছক্কার পর আউট হওয়ার এক বল আগে ডিপ ফাইন লেগে দিয়ে দ্বিতীয় ছক্কাটা মেরেছেন নিজের সিগনেচার শটে।
১৭৭ স্ট্রাইকরেটের এই ইনিংসে শামীমের গো টু শট ছিল কাট। অফসাইড থেকেই বের করেছেন সবচেয়ে বেশি রান। অথচ বছরখানেক আগেও শামীমের খানিকটা বদনামই ছিল, কেবল লেগ সাইড রিজিওনে শট খেলার জন্য। ফুল লেংথ বলে স্কুপ করে তুলে মারবেন ফাইন লেগের ওপর দিয়ে নইলে বাউন্সার এলে সেটা সামলাবেন অফস্টাম্পের দিকে সরে এসে জায়গা বানিয়ে। সেই দুর্নাম বা বদনাম শামীম যে ঘুচাতে চান, প্রচেষ্টার প্রমাণ দিলেন ডাম্বুলার ইনিংসে।
শটের রেঞ্জ বাড়ানোর প্রশ্নে কতটা উন্নতি করেছেন শামীম? এইচপির ব্যাটিং কোচ রাজিন সালেহ ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন এক বছর আগের টপ এন্ড টি-টোয়েন্টিতে। যে টুর্নামেন্টে শামীমদের ব্যাটিং কোচ ছিলেন তিনি।
টপ এন্ড টি-টোয়েন্টির গত আসরেশামীমের ৮ ম্যাচে ১৮৬ রান, স্ট্রাইকরেট ছিল ১১৬। পরিসংখ্যান যেমনই হোক, শামীমের উন্নতির গ্রাফ রাজিন দেখেছেন তার ব্যাটিং এপ্রোচে। অ্যাডিলেড স্ট্রাইকার্সের বিপক্ষে ৩২ বলে ৪২*, পাকিস্তান শাহীন্সের সাথে ৩৮ বলে ৪৪ ও স্বাগতিক নর্দার্ন টেরিটরিকে হারানোর প্রথম সেমিফাইনালে ৩৪ বলে ৪১*’ সবই কাছ থেকে দেখেছেন রাজিন।
তাই শ্রীলংকায় উইকেটের চারপাশে শামীমকে শট খেলতে দেখে খুব একটা অবাক হননি রাজিন, ‘শামীমের এই জায়গাটায় ইপ্রুভ করেছে গত বছরের এইচপি দলের অস্ট্রেলিয়া সফরে টপ এন্ড টি-টোয়েন্টিতে। সেই সফরে আমি ব্যাটিং কোচ ছিলাম। সেই সফরে শামীম দারুণ ক্রিকেট খেলেছে। একটা টপ সিরিজ গিয়েছে ওর সেবার।’
বাংলাদেশের হয়ে ৩১ টি-টোয়েন্টি খেলা শামীমকে নিয়ে রাজিন আরও বলেন, ‘গত বছর থেকে এই জায়গাটায় ও দারুণ ইম্প্রুভ করেছে। এবারের ডিপিএলেও যদি দেখেন, কয়েকটা অসাধারণ ম্যাচ জিতিয়েছে। আমি মনে করি এখানটায় ওর ইম্প্রুভ করা জরুরি ছিল। কারণ ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট খেলতে হলে শটের রেঞ্জ একদিকে থাকলে হবে না। আমরা ছয়-সাতের জন্য একটা ক্রিকেটার পেলাম, যে কন্ট্রিবিউট করতে পারে। শামীমও দেখিয়েছে এই পজিশনে খেলার সামর্থ্য তার আছে।’
ব্যাটার শামীম নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ তো দিয়েছেনই। ফিল্ডার হিসেবে দুর্দান্ত, সমতায় ফেরার দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টিতে দারুণ এক রান আউটে বদলে দিয়েছিলেন বাংলাদেশ দলের গোটা চেহারা। সাথে কাজ চালানোর মতো বোলিংটাও বেশ ভালোই করেন। ওয়ানডেতে ৪-৫ ওভার কিংবা টি-টোয়েন্টিতে কমপক্ষে ২ ওভারের জন্য অধিনায়কের ভরসা হতে পারেন তিনি। শ্রীলংকা সফরের ওয়ানডে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে ৯ ওভার বল করে মাত্র ২২ রানে নিয়েছেন ১ উইকেট। অবশ্য বোলিং ফিগারের চেয়ে বেশি কথা বলবে সেই ম্যাচে তার রান আটকানোর ট্যাকটিকস।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায় শেষ টি-টোয়েন্টির কথাও। অধিনায়ক লিটন দাস তাকে দিয়ে করিয়েছেন মোটে ২ ওভার, ১০ রান দিয়ে পেয়েছেন কামিন্দু মেন্ডিস। সব মিলিয়ে টি-টোয়েন্টিতে নতুন অলরাউন্ডার হিসেবে শামীমের গড়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখছেন অনেকেই। রাজিন সালেহ আশার কথা শোনালেও সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার সুমন সময় চাইলেন এক বছর। তার চোখে শামীম এখন মিনি অলরাউন্ডার, ‘এটা মনে হয় আমরা এক বছর পরে বলতে পারব। এখন ওকে বলব মিনি অলরাউন্ডার। বাংলাদেশ দলের প্রেক্ষাপটে সবাই চাইবে ও যেন পরিপূর্ণ অলরাউন্ডার হয়ে উঠে।’


