সাগরিকার ব্যাটিং বান্ধব উইকেটে নাজমুল হোসেন শান্তর সেঞ্চুরিতে ৪০ ওভারের আগে ২০০ পেরিয়েও বাংলাদেশের ইনিংস থামল ৮ উইকেটে ২৬৫ রানে। ঐতিহ্যগতভাবে চট্টগ্রামের এই মাঠ যেহেতু ব্যাটারদের পক্ষেই কথা বলে, তাই হারের শঙ্কাও ছিল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ডের সিরিজ নির্ধারণী তৃতীয় ওয়ানডেতে। তবে মোস্তাফিজুর রহমানের দারুণ বোলিংয়ে উড়ে গেল সব সংশয়। কাটার মাস্টারের নেয়া পাঁচ উইকেটে চট্টগ্রামের বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট ক্রিকেট স্টেডিয়ামে নিউজিল্যান্ডকে ২১০ রানে অল আউট করে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জিতল বাংলাদেশ।
৫৫ রানের এই জয়ে এই নিয়ে ঘরের মাঠে টানা তিন সিরিজ জিতল বাংলাদেশ। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে জয়, চলতি বছরের মার্চে পাকিস্তানকে ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশের পর জয়ের ধারাবাহিকতা রইল এই সিরিজেও। কিউইদের বিপক্ষেও সব মিলিয়ে তৃতীয় সিরিজ জয়। সর্বশেষটি এসেছিল ২০১৩ সালে।
মেহেদী হাসান মিরাজের দলের ধারাবাহিকতার ছন্দে পতন হতেই পারত, যদি না শান্ত চট্টগ্রামের তপ্ত রোদে ১১৯ বলে ১০৫ রানের ইনিংসটা না খেলতেন। উইকেটে যখন আসেন, তখন স্কোরবোর্ডে ৯ রানে ২ উইকেট। দুঃস্বপ্নের সেই শুরু শান্ত কাটিয়ে ওঠেন লিটন দাসের সাথে চতুর্থ উইকেটে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১৬০ রানের রেকর্ড জুটিতে।
এই জুটিতে লিটনের অবদান ৯১ বলে ৭৬, ইনিংসে ছিল ৩ চার ও ১ ছক্কা। উইকেটে টিকে থেকে সেঞ্চুরির সম্ভাবনা জাগালেও শেষ পর্যন্ত ইনিংস বড় করতে পারেননি এই ডানহাতি ব্যাটার। স্ট্রাইক রোটেটকে প্রাধান্য দিয়ে গড়া এই ইনিংস থেমেছে জেইডেন লেনক্সকে ইনসাইড আউট করে তুলে মারতে গিয়ে স্টাম্প খুইয়ে।
এদিকে শান্তর ব্যাটে ফিফটি ছিল না ১৩ ইনিংস ধরে, সেই খরা ঘুচল নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে মিরপুরে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে। সেঞ্চুরির দেখা নেই বছর দুয়েক, চতুর্থ সেঞ্চুরির জন্য শান্ত বেছে নিলেন এই ম্যাচকেই। ১১৪ বলে করা চতুর্থ সেঞ্চুরিকে টেনে নিলেন ১০৫ পর্যন্ত। লেনক্সের দ্বিতীয় শিকার হওয়ার আগে তার ব্য্যাট থেকে আসে ৯ চার ও ২ ছক্কা।
মাঝারি মানের এই পূঁজি নিয়েও অবশ্য বাংলাদেশের বোলাররা ভড়কে যাননি। নাহিদ-শরীফুল-মোস্তাফিজদের দারুণ বোলিংয়ে ১৩৭ রানের মধ্যেই পড়ে তাদের প্রথম ছয় উইকেট। যদিও শেষদিকে ডিন ফক্সক্রফটের ৭ ছক্কায় ৭২ বলে ৭৬ রানের ইনিংসে হারের ব্যবধান কমায় কিউইরা।
চোট কাটিয়ে একাদশে ফেরা মোস্তাফিজ চতুর্থ ওভারেই এক বাউন্সারে তুলে নেন হেনরি নিকোলসের উইকেট। আগের ম্যাচে গতির ঝড়ে পাঁচ উইকেট নেয়া নাহিদ রানাও বসে থাকেননি, ২৫ বল খেলে ধাতস্থ হওয়া উইল ইয়াংকে ১৪তম ওভারে ফেরান এই ডানহাতি পেসার। এরপর ৩৩তম ওভারে দারুণ এক ইয়র্কারে উপড়েছেন জশ ক্লার্কসনের স্টাম্প উড়িয়ে।
তবে সিরিজে প্রথমবার খেলতে নামা মোস্তাফিজ ছাড়িয়ে গেছেন সবাইকে। ক্যারিয়ারে ষষ্ঠবারের মতো ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়েছেন এই বাঁহাতি পেসার। ৫৮ রান করা নিক কেলিকে ফিরিয়েছেন ধন্দ্বে ফেলা এক স্লোয়ারে তানজিদের হাতে ক্যাচ দিতে বাধ্য করে, একইসাথে ভাঙে তার সাথে মুহাম্মদ আব্বাসের জমে ওঠা ৪৭ রানের জুটি। নাথান স্মিথও স্লোয়ারে পরাস্ত হয়েছেন মিরাজের হাতে ক্যাচ দিয়ে। লেনক্সকে ফেরানোর পর রোর্ককে বোল্ড করে পূর্ণ করেন পাঁচ উইকেট, যা চট্টগ্রামের মাঠে কোনো পেসারের প্রথমবার পাঁচ উইকেট নেয়ার কীর্তিও বটে। ৯ ওভারে ২ মেইডেনসহ ৪৩ রানে ৫ উইকেট নিয়ে ম্যাচ শেষ করেছেন তিনি। এই বোলিং ফিগার দিয়ে বাঁহাতি পেসারদের মধ্যে আলাদা জায়গা করেছেন মোস্তাফিজ, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ছয়বার ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়েছেন তিনি। ৯বার ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়ে শীর্ষে আছেন মিচেল স্টার্ক।
এর আগে ২৫ রান আব্বাস ফিরেছেন শরীফুলের বলে বোল্ড হয়ে। মিরাজের বলে উইকেট দেন টম ল্যাথাম। মিডল স্টাম্পে থাকা ফুল লেংথ বলে হয়ে সুইপ করতে গিয়ে লেগে শর্ট ফাইন লেগে শরীফুলের হাতে সহজ ক্যাচ দেন এই বাঁহাতি ব্যাটার।
টসে হেরে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই চাপে পড়ে বাংলাদেশ। ইনিংসে উইল ও’রোর্কের করা দ্বিতীয় বলেই উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে ফিরে যান সাইফ হাসান। দ্বিতীয় ম্যাচে ৭৬ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস খেলে দলকে সমতায় ফেরানো তানজিদ হাসানও ফিরেছে রোর্কের বল থার্ড ম্যানে গাইড করে সিংগেল নিতে গিয়ে বোল্ড হয়ে। সৌম্য সরকার এসে তিন চারে সেট হওয়ার ইংগিত দিলেও তানজিদের মতোই উইকেট দিয়েছেন রোর্ককে একইভাবে খেলতে গোয়ে বোল্ড হয়ে।
অবশ্য শান্ত-লিটনের ১৬০ রানের বড় জুটিতে ভর করে লড়াইয়ের রসদ পেলেও ডেথ ওভারে সুবিধা করতে পারেনি বাংলাদেশ। শেষ ১০ ওভারে ৪ উইকেট হারিয়ে ৬১ রান তুলতে পারেন তাওহিদ হৃদয়রা। শেষ দিকে নেমে ১৮ বলে ২২ রান করেন মিরাজ, হৃদয়ের ব্যাট থেকে আসে ২৯ বলে ৩৩ রানের ইনিংস। সাইফ, তানজিদ ও সৌম্যর উইকেটে নিয়ে কিউইদের সেরা বোলার ও’রোর্ক। দুটি করে উইকেট নেন লিস্টার ও লেনক্স।


