আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে সীমান্তঘেঁষা জেলা লালমনিরহাটে পুরোদমে জমে উঠেছে কোরবানির পশুর হাট। জেলার ১৯টি স্থায়ী ও ৬টি অস্থায়ী পশুর হাটে এখন ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় আর হাঁকডাকে মুখর চারপাশ।
তবে গো-খাদ্যের দাম বাড়ায় পশু প্রস্তুতের খরচ বৃদ্ধি এবং বাজারে কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাওয়া নিয়ে খামারি ও বিক্রেতাদের মধ্যে এক ধরনের শঙ্কা কাজ করছে। অন্যদিকে, পশুর দাম কিছুটা চড়া বলে দাবি করছেন সাধারণ ক্রেতারা।
প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, লালমনিরহাট জেলায় এবার কোরবানির পশুর চাহিদা মিটিয়ে প্রায় ৫৩ হাজার গবাদিপশু উদ্বৃত্ত থাকবে। জেলার ১৮ হাজারেরও বেশি খামারি এবার প্রায় ২ লাখ ৬ হাজার পশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত করেছেন, যেখানে স্থানীয় চাহিদা ১ লাখ ৫৩ হাজার। এই উদ্বৃত্ত পশুগুলো স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হচ্ছে।
জেলার সবচেয়ে বড় পশুর হাট বড়বাড়ী, চাপারহাট, দুরাকুটি ও শিয়ালখোঁওয়াসহ বিভিন্ন হাট ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকেই ছোট, বড় ও মাঝারি সাইজের গরুর সরবরাহ প্রচুর। এবারের হাটের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো, বাজারে ভারতীয় গরু নেই বললেই চলে। সম্পূর্ণ দেশি জাতের পশুর ওপর নির্ভর করেই জমে উঠেছে এবারের বেচাকেনা।
হাটে পশুর সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলেও দাম নিয়ে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের মধ্যে দ্বিমত দেখা গেছে। লালমনিরহাট সদরের দুরাকুটি হাটে আসা স্থানীয় ক্রেতা মফিজুল ইসলাম জানান, বাজারে গরুর কোনো অভাব নেই, ছোট-বড় সব সাইজের গরুই আছে। কিন্তু বিক্রেতারা দাম ছাড়ছেন না। গত বছর যে সাইজের গরু ৮০ হাজার টাকায় কেনা গেছে, এবার সেটার দাম চাওয়া হচ্ছে এক লাখের ওপরে। পছন্দ হলেও বাজেটে না মেলায় এক হাট থেকে অন্য হাটে ঘুরতে হচ্ছে।

তবে ক্রেতাদের এই দাবির সঙ্গে একমত নন স্থানীয় খামারিরা। সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ এলাকার খামারি আতিয়ার রহমান বলেন, খৈল, ভুষি আর খড়ের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে একটা গরু কোরবানি পর্যন্ত প্রস্তুত করা খুব কষ্টের। বাজারে গরুর দাম বেশি মনে হলেও উৎপাদন খরচই উঠছে না। কাঙ্ক্ষিত দাম না পেলে বড় লোকসানে পড়তে হবে।
জেলার কালীগঞ্জের খামারি খায়রুল ইসলাম জানান, সারা বছর কষ্ট করে পশু পালন করা হয় এই ঈদের আশায়। হাটে ভারতীয় গরু নেই, এটি স্বস্তির খবর হলেও বড় পাইকাররা সিন্ডিকেট করে দাম কম বলছেন। ফলে ভালো দামের আশায় হাটে হাটে ঘুরতে হচ্ছে।
লালমনিরহাটের পশুর মান ভালো হওয়ায় প্রতি বছরের মতো এবারও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসেছেন বড় বড় ব্যবসায়ী ও পাইকাররা। ঢাকা থেকে বড়বাড়ী হাটে আসা গরু ব্যবসায়ী আলহাজ্ব জয়নাল আবেদীন জানান, সীমান্তে কড়াকড়ি থাকায় এবার বাজারে কোনো ভারতীয় গরু নেই, সব দেশি জাতের ভালো গরু। তবে স্থানীয় বাজারে গৃহস্থ ও খামারিরা দাম একটু বেশি চাচ্ছেন। এই দামে গরু কিনে ট্রাকে করে ঢাকা নিয়ে গিয়ে লেবার খরচ ও হাসিল দিয়ে কতটুকু লাভ করা যাবে, তা নিয়ে চিন্তায় আছেন। বাজার একটু স্থিতিশীল হলে পুরোদমে কেনা শুরু করবেন বলে তিনি জানান।
এদিকে খামারি, ক্রেতা, বিক্রেতা ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তায় নানা উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিটি হাটের ইজারাদার কর্তৃপক্ষ। শিয়ালখোঁওয়া হাটের ইজারাদার মোঃ রবিউল ইসলাম জানান, ব্যবসায়ীরা যাতে নির্বিঘ্নে বড় অঙ্কের টাকা লেনদেন করতে পারেন, সেজন্য হাটের মূল পয়েন্টগুলোতে জাল টাকা শনাক্তকারী মেশিন বসানো হয়েছে। এছাড়া মলম পার্টি বা অজ্ঞান পার্টির দৌরাত্ম্য ঠেকাতে নিজস্ব ৩টি স্বেচ্ছাসেবী দল এবং পুলিশ সার্বক্ষণিক টহল দিচ্ছে। দূরপাল্লার ট্রাক লোডিংয়েও বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।
লালমনিরহাট জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, হাটে অসুস্থ বা রোগাক্রান্ত পশু শনাক্তকরণ এবং খামারিদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসাসেবা দিতে জেলার প্রতিটি অনুমোদিত হাটে অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প সক্রিয় রয়েছে। ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক বাজার মনিটরিং করছে, যাতে কোনোভাবেই ক্রেতারা ক্ষতিকর হরমোনযুক্ত বা অসুস্থ পশু কিনে প্রতারিত না হন।


