মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের মানবিক বিপর্যয় নিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বিশেষ উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে বিশ্বনেতারা টেকসই সমাধান, ন্যায়বিচার ও নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের পক্ষে জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। বক্তারা বলেন, আট বছর ধরে চলমান এ সংকট আর দীর্ঘায়িত হতে দেওয়া যাবে না।
সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, রোহিঙ্গা সংকট দশকের পর দশক চলতে দেওয়া যাবে না। তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করা এবং ন্যায়বিচারের মাধ্যমে দায়ীদের জবাবদিহিতার মুখোমুখি করাই একমাত্র টেকসই সমাধান।
মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বর হামলা ও নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আসা মানুষের দুঃখজনক পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ পরিষদে বক্তারা নিরাপদ অঞ্চল, আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং ন্যায়বিচারের আহ্বান জানান। তারা পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে পাঠানোর কথাও জোর দিয়ে বলেন।
জাতিসংঘের সদর দপ্তরে মঙ্গলবার (স্থানীয় সময়) অনুষ্ঠিত হলো রোহিঙ্গা মুসলিম ও মিয়ানমারের অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সংকট নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলন। গত আট বছরেরও বেশি সময় ধরে এই মানবিক বিপর্যয় আন্তর্জাতিক এজেন্ডায় থাকলেও সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠেছে। এ সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান, জাতিসংঘের শীর্ষ কর্মকর্তা, আঞ্চলিক সংস্থা এবং মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
২০২৪ সালের শেষভাগে সাধারণ পরিষদের এক প্রস্তাব অনুসারে আহূত এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের উদ্দেশ্য হলো রোহিঙ্গা ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের সংকটকে আন্তর্জাতিক মনোযোগে ধরে রাখা, মাটির বাস্তবতা মূল্যায়ন করা এবং একটি সময়সীমা নির্ধারিত বাস্তবসম্মত সমাধান পরিকল্পনা করা—যার মধ্যে থাকবে বাস্তুচ্যুতদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন রোহিঙ্গাদের দ্রুত রাখাইনে প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করতে।
মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের জন্ম মিয়ানমারে, তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, ‘রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরানোই একমাত্র কার্যকর সমাধান। এ ইস্যুকে মিয়ানমারের বৃহত্তর সংস্কারের সঙ্গে জিম্মি করে রাখা যাবে না।’
মুহাম্মদ ইউনূস তার বক্তব্যে বলেন, ‘গণহত্যা শুরুর আট বছর পরও রোহিঙ্গাদের দুর্দশা অব্যাহত রয়েছে। এ সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ অনুপস্থিত, আন্তর্জাতিক অর্থায়নও মারাত্মক ঘাটতির মুখে।’
তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে হবে, যেন তারা অবিলম্বে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধ করে এবং দ্রুত রাখাইনে তাদের প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা শুরু করে। এটিই একমাত্র সমাধান। সংকটের সমাধানকে মিয়ানমারের বৃহত্তর সংস্কারের সঙ্গে জিম্মি করে রাখা উচিত নয়।’
প্রধান উপদেষ্টা সতর্ক করে বলেন, আন্তর্জাতিক সহায়তা ভয়াবহভাবে হ্রাস পাচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে শরণার্থীদের আন্তর্জাতিক সুরক্ষার ব্যয় বহন অসম্ভব হয়ে পড়বে। তাই শান্তিপূর্ণ বিকল্প হিসেবে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণভাবে ফেরত পাঠানো ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই।
তিনি জানান, রোহিঙ্গারা নিজেরাও বারবার দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সংঘাত এড়াতে যারা নতুন করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, তাদের অবিলম্বে ফিরিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।
মুহাম্মদ ইউনূস স্পষ্ট করেন যে, বাংলাদেশ এ সংকটের শিকার। ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার ফলে আর্থিক, সামাজিক ও পরিবেশগত চাপ তীব্র আকার ধারণ করেছে। রাখাইনের দিক থেকে মাদক প্রবাহসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোকে হুমকির মুখে ফেলছে।
তিনি আরও বলেন, দারিদ্র্য ও বেকারত্বের মতো উন্নয়নজনিত চ্যালেঞ্জের কারণে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের কর্মসংস্থান দেওয়া সম্ভব নয়।
সাত দফা প্রস্তাব
রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি প্রধান উপদেষ্টা সাত দফা প্রস্তাব তুলে ধরেন। এগুলো হলো-
১. রাখাইনে স্থিতিশীলতা এনে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের রোডম্যাপ প্রণয়ন।
২. মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করে সহিংসতা বন্ধ করা এবং পুনর্বাসন শুরু।
৩. রাখাইনের স্থিতিশীলতায় আন্তর্জাতিক সহায়তা নিশ্চিত করা ও আন্তর্জাতিক বেসামরিক উপস্থিতি গড়ে তোলা।
৪. রোহিঙ্গাদের সমাজ ও প্রশাসনে টেকসই অন্তর্ভুক্তির জন্য আস্থা গড়ার পদক্ষেপ নেওয়া।
৫. দাতাদের অবদান বাড়িয়ে যৌথ প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা সম্পূর্ণ অর্থায়ন করা।
৬. জবাবদিহিতা ও পুনর্বাসনমূলক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা।
৭. মাদক অর্থনীতি ভেঙে দেওয়া এবং সীমান্ত পারের অপরাধ দমন।
বিশ্বকে এক সঙ্গে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে বক্তব্যের শেষে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘বিশ্ব আর রোহিঙ্গাদের অপেক্ষায় রাখতে পারে না। আজ আমরা প্রতিজ্ঞা করি—এই সংকটের স্থায়ী সমাধানে একসঙ্গে কাজ করব। বাংলাদেশ এ লক্ষ্যে পূর্ণ সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।’
সাধারণ পরিষদের সভাপতি আনালেনা বেয়ারবক বলেন, ‘গত আট বছরে লাখো রোহিঙ্গা তাদের ঘরবাড়ি হারিয়ে শরণার্থী শিবিরে দিন কাটাচ্ছে। শিশুদের পিঠে নিয়ে, সামান্য টাকা নিয়ে তারা ঘর ছেড়েছে। অনেকে শরণার্থী শিবিরে পুরো শৈশব কাটাচ্ছে ছেঁড়াফাটা তাঁবুর নিচে। বর্তমানে মিয়ানমারের ভেতরে ৩ দশমিক ৫ মিলিয়নেরও বেশি রোহিঙ্গা জরুরি মানবিক সহায়তার প্রয়োজন। বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে—এই বোঝা অনির্দিষ্টকাল বহন করা সম্ভব নয় বলে তিনি সতর্ক করেন।’
তিনি কক্সবাজার শিবিরের ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘যদি পানি জীবন হয়, তবে এখানে জীবন থমকে আছে।’
সম্মেলনে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের তরুণ নেতারা সরাসরি নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
আরাকান ইয়ুথ পিস নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা রফিক হুসন বলেন, রোহিঙ্গারা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করতে চায়। তিনি রাখাইনে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নিরাপদ অঞ্চল ও বাংলাদেশ থেকে মানবিক করিডর তৈরির আহ্বান জানান।
রোহিঙ্গা স্টুডেন্টস নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা মাউং সাওয়েদ্দোল্লাহ বলেন, তিনি প্রথম রোহিঙ্গা, যিনি বাংলাদেশি শিবির থেকে উঠে নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে পড়ছেন। কিন্তু আর্থিক সহায়তা না পেলে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হবে। তিনি বিশ্ব বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্রগুলোকে রোহিঙ্গা শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি প্রদানের অনুরোধ জানান।
রিফিউজি উইমেন ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিসের নির্বাহী পরিচালক লাকি করিম বলেন, তিনি ১৪ বছর বয়সে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। গণহত্যা এখনও চলছে। ফেরত যাওয়ার বাস্তব শর্ত নিয়ে সৎ আলোচনা প্রয়োজন: চলমান দুর্ভিক্ষ ও ট্রমার মধ্যে কীভাবে প্রত্যাবর্তন সম্ভব?
উইমেনস পিস নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা ওয়াই ওয়াই নু বলেন, ‘অস্থায়ী সমাধান নয়, স্থায়ী পরিবর্তন দরকার। তিনি মানবিক করিডর, অপরাধীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা, গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং রোহিঙ্গাদের শিক্ষা ও কাজের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।’
জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত জুলি বিশপ সতর্ক করে বলেন, ‘ডিসেম্বর মাসে মিয়ানমারে যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, তা সহিংসতা বাড়াতে পারে।’ জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনার ভলকার টার্ক বলেন, রোহিঙ্গাদের ভোটাধিকার নেই, তাই এই নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হতে পারে না। তিনি সংকটকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে পাঠানোর আহ্বান জানান।
ইউএনএইচসিআর এর প্রধান ফিলিপো গ্রান্ডি বলেন, ৫ দশমিক ১ মিলিয়ন মানুষ বাস্তুচ্যুত, সংকট অব্যাহত। মানবিক তহবিল মারাত্মক ঘাটতিতে।
আসিয়ানের বিশেষ দূত ওসমান হাশিম রোহিঙ্গাদের অন্তর্ভুক্ত করে শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানান।
জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য জীবন আজ পর্যন্ত সবচেয়ে ভয়াবহ। সামরিক সরকারের নির্বাচন অবাধ-নিরপেক্ষ নয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে পরিস্থিতি পাঠানোর আহ্বান জানান তিনি।
আন্তর্জাতিক বিশ্বের প্রতিক্রিয়া
ইন্দোনেশিয়া জানায়, ‘৮ বছর যথেষ্ট; কয়েক দশক যেন না হয়।’
মিয়ানমারের বৈধ প্রতিনিধি বলেন, সামরিক জান্তা ‘প্রতারক নির্বাচন’করছে, একে প্রত্যাখ্যান করতে হবে।
পোল্যান্ড: রাশিয়াসহ কিছু রাষ্ট্র মিয়ানমারের সেনাদের প্রাণঘাতী প্রযুক্তি দিচ্ছে।
গাম্বিয়া: আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইইউ: রোহিঙ্গাদের মর্যাদা, নাগরিকত্ব ও সমান অধিকার দিতে হবে।
ওআইসি (তুরস্ক): রোহিঙ্গা নিধনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, আন্তর্জাতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞার আহ্বান।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও সহায়তার ঘোষণা
রোহিঙ্গা মুসলিম ও মিয়ানমারের অন্যান্য সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে বিভিন্ন দেশ মানবিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে
যুক্তরাষ্ট্র: ৬০ মিলিয়ন ডলার সহায়তার ঘোষণা।
যুক্তরাজ্য: ৩৬ মিলিয়ন ডলার নতুন সহায়তা।
জাপান: ২০০ মিলিয়নেরও বেশি সহায়তা ও শিক্ষা-প্রশিক্ষণ প্রকল্প।
থাইল্যান্ড: আশ্রয়, মানবপাচার প্রতিরোধ ও ৪ মিলিয়ন ডলার সহায়তা।
মালয়েশিয়া: শরণার্থী বহনকারী দরিদ্র ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোকে আরও সহায়তার আহ্বান।
চীন বলেছে, পুনর্বাসনের জন্য মিয়ানমার-বাংলাদেশের মধ্যে সরাসরি সংলাপ জরুরি এবং মানবাধিকার ইস্যুর রাজনৈতিক অপব্যবহার এড়াতে হবে। রাশিয়া পশ্চিমাদের চাপ প্রত্যাখ্যান করে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির বাস্তবায়নকেই সমাধান হিসেবে দেখছে।


