রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সমুদ্রে ভাসিয়ে দিচ্ছে ভারত: বিবিসি

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সমুদ্রে ভাসিয়ে দিচ্ছে ভারত: বিবিসি
গভীর অনিশ্চিয়তায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ভবিষ্যত । ছবি: এপি/ইউএনবি
Advertisement
Advertisement

দিল্লিতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জোর করে নৌকায় তুলে বঙ্গোপসাগরে ভাসিয়ে দিচ্ছে ভারত — মানবাধিকার লঙ্ঘনের এমন গুরুতর অভিযোগ এনেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।

সাম্প্রতিক ওই ঘটনায় বেঁচে যাওয়া রোহিঙ্গারাদের বরাত দিয়ে বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, দিল্লিতে জাতিসংঘের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির থেকে তালিকাভুক্ত রোহিঙ্গাদের কয়েকটি দলে ভাগ করে জোর করে মিয়ানমারে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে দেশটি। পরে বঙ্গোপসাগরের একটি দ্বীপে নিয়ে তাদের নৌবাহিনীর জাহাজে তোলা হয় এবং লাইফ জ্যাকেট পরিয়ে আন্দামান সাগরে ফেলে দেওয়া হয়।

তিনমাস পর ওই ‘ভাগ্যহত’ রোহিঙ্গাদের দক্ষিণ-পশ্চিম মিয়ানমারের ‘বা হতু আর্মি’ (বিএইচএ) নামের একটি সশস্ত্র বিদ্রোহীগোষ্ঠীর আশ্রয়ে খুঁজে পায় বিবিসির অনুসন্ধানী দল।

বেঁচে ফেরা এমনই এক রোহিঙ্গা সৈয়দ নূর। তিনি জানান, তাদের জোর করে মিয়ানমারে ফেরাতে দিল্লি সরকারের ভয়াবহ নির্যাতনের কথা।

নূর বলেন, ‘মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ থেকে প্রাণ বাঁচাতে পরিবার সমেত ভারতে পালিয়ে যাই। আশ্রয় নেই দিল্লির জাতিসংঘ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। ভারত সরকার আমাদের রোহিঙ্গা শরণার্থী হিসেবে চিহ্নিত করে পরিচয়পত্রও দেয়।’

তিনি জানান, গত ৬ মে দিল্লির বিভিন্ন এলাকা থেকে জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশনারের দপ্তরের (ইউএনএইচসিআর) কার্ডধারী ৪০ রোহিঙ্গাকে বায়োমেট্রিক আপডেটের জন্য স্থানীয় থানায় যাওয়ার নির্দেশ দেয় ভারত সরকার। তবে কোনো তথ্য বা আঙ্গুলের ছাপ না নিয়েই তাদের ইন্দেরলোক ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি করা হয়।

‘৭ মে আমাদের হিন্দন বিমানবন্দরে নেওয়া হয়। সেখান থেকে বিমানে করে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে পাঠানো হয়। বিমান থেকে নামার পর আমরা দুটি বাস দেখি, তাতে “ভারতীয় নৌবাহিনী” লেখা ছিল’, বলেন সৈয়দ নূর।

জাতিসংঘের শরণার্থী শিবিরে রোহিঙ্গাদের ঢল। ছবি: এপি/ইউএনবি

আরেক ভুক্তভোগী রোহিঙ্গা মোহাম্মদ সাজ্জাদ জানান, ওই বাসে উঠার পর তাদের সবার হাত প্লাস্টিকের দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা হয় এবং মুখ কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। এরপর তাদের নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজে তোলা হয়।

আরও পড়ুন

তিনি বলেন, ‘১৪ ঘণ্টা সমুদ্রে থাকার পর ভারতীয় সেনারা আমাদের কিছু খাবার দেয়। তবে যখনই আমরা জানতে চাই, আমাদের কোথায় নেওয়া হচ্ছে, তখনই মারধর ও হেনস্থা করেন ওই সেনারা।’

এমনকি রোহিঙ্গাদের ধর্মীয় পরিচয় নিশ্চিত করতে তাদের ওপর নির্যাতন করা হয় বলে দাবি করেন নূর ও সাজ্জাদ।

তারা জানান, আন্দামান সাগরে মিয়ানমার উপকূল ও ভারতীয় সমুদ্র সীমার শেষ প্রান্তে নিয়ে তাদের জাহাজ থেকে নৌকায় তুলে সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। তারা ভাসতে ভাসতে মিয়ানমার উপকূলে ফেরত যেতে সক্ষম হন এবং সশস্ত্র বিএইচএ সদস্যরা তাদের উদ্ধার করে নিজেদের কাছে আশ্রয় দেন।’

আমিন নামের আরেক রোহিঙ্গা ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, ‘একজন মানুষকে এভাবে সাগরে ফেলে দেওয়া যায়? পৃথিবীজুড়ে মানবতার বুলি আওড়ানো হয়, কিন্তু আমি ভারত সরকারের মধ্যে মানবতার কোনো চিহ্ন দেখিনি।’

গভীর অনিশ্চিয়তায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ভবিষ্যত । ছবি: এপি/ইউএনবি

দিল্লির বিরুদ্ধে এমন ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ পেয়েছেন মিয়ানমারে মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি টমাস অ্যান্ড্রুজ।

তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরাতে সমুদ্রে ফেলে দেওয়ার ঘটনা প্রমাণের মতো উপযুক্ত তথ্য আমাদের হাতে আছে। এসব তথ্য জেনেভায় ভারতীয় মিশনের প্রধানের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। তবে তিনি কোনো জবাব দিতে পারেননি।’

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছেও ওই গুরুতর অভিযোগ জানিয়ে বিবিসি একাধিকবার যোগাযোগ করলেও তারা এর কোনো জবাব দেয়নি বলে জানানো হয় প্রতিবেদনে।

এদিকে, ভারতে রোহিঙ্গারা ‘শরণার্থী’ হিসেবে বিবেচিত হবে, নাকি ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে তাদের ফেরত পাঠানো যাবে- ২৯ সেপ্টেম্বর সে বিষয়ে রায় দেবে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট।

জাতিসংঘের মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, ভারতে রোহিঙ্গাদের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। ভারত সরকার তাদের শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে বরং তাদের অবৈধ অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করতে আগ্রহী।

ভারতে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার নথিভুক্ত রোহিঙ্গার সংখ্যা ২৩ হাজার ৮০০।  তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, মিয়ানমার থেকে ভারতে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রকৃত সংখ্যা ৪০ হাজারের বেশি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad