কথা ছিল, মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা মুসলমানরা এ বছর নিজের দেশেই ঈদুল ফিতর উদযাপন করবেন। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি, এখনো কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোয় আটকে পড়ে আছেন ১০ লাখেরও বেশি শরণার্থী।
যাদের জীবন ঘেরা গভীর অনিশ্চয়তায়। কারণ সময়ের সঙ্গে কমছে আন্তর্জাতিক সহায়তা, অন্যদিকে মিয়ানমারের পরিস্থিতিও অনুকূল নয়। আর এসবের মধ্যেই আরও একটি প্রধান ধর্মীয় উতসব পালন করছেন রোহিঙ্গারা।
গত বছরের ১৪ মার্চ এক ইফতার মাহফিলে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন যে, ২০২৬ সালের ঈদে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা হয়তো মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ফিরে যেতে পারবে এবং নিজ বাড়িতে উৎসব পালন করতে পারবে।
তার পাশে দাঁড়িয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব এবং ইউএনএইচসিআরের সাবেক প্রধান আন্তোনিও গুতেরেসও সেই আশাবদকে সমর্থন করেছিলেন।
এক বছর পর, সেই স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেছে।

শনিবার বাংলাদেশের মানুষ যখন আনন্দময় পরিবেশে ঈদুল ফিতর উদযাপন করছেন, তখন রোহিঙ্গা শরণার্থীরা আরও একবার বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবির কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ ক্যাম্পে অবরুদ্ধ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। এই শরনার্থীদের অধিকাংশই ইসলাম ধর্মাবলম্বী।
দীর্ঘ আলোচিত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এখনও শুরু হয়নি, অন্যদিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতির ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। যার ফলে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে কেবল অসম্ভব যেকোনো ধরনের প্রত্যাবর্তনকে কেবল অসম্ভবই নয়, বরং অনিরাপদ করে তুলেছে।
অর্থাৎ, অগ্রগতির পরিবর্তে সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য জুড়ে নতুন করে শুরু হওয়া সহিংসতা নতুন করে বাস্তুচ্যুতির পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যা নতুন করে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।
মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধুমাত্র মার্চের প্রথম দুই সপ্তাহেই প্রায় ৫০০ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বারবারই সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশের পক্ষে আর নতুন কাউকে জায়গা দেওয়া সম্ভব নয।
কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে টাইমস অব বাংলাদেশের সঙ্গে কথা হয় বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা নাগরিকদের সঙ্গে।
বেশিরভাগ রোহিঙ্গার কাছেই গত বছরের সেই আশ্বাস এখন অন্তঃসারশূন্য মনে হচ্ছে।

কুতুপালং ক্যাম্পের অ্যাক্টিভিস্ট ইউনুস আরমান বলেন, বিশ্বব্যাপী মানুষের কাছে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে মনোযোগ সাময়িকভাবে বেড়েছিল। কিন্তু ক্যাম্পের ভেতরের জীবন কেবল কঠিনতরই হয়েছে।
তিনি বলেন, `আমাদের কষ্টের শেষ নেই; সময়ের সঙ্গে এটি আরও জটিল হচ্ছে।‘
দীর্ঘ এক মাস রোজার পর এসেছে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর। সাধারণত আনন্দ, প্রার্থনা এবং পারিবারিক মিলনের মাধ্যমে উদযাপিত হয় এটি। কিন্তু ক্যাম্পগুলোতে সেই উদযাপন নিরব শোকে রূপ নিয়েছে।
শনিবার সকালে হাজার হাজার রোহিঙ্গা ঈদের নামাজ আদায় করতে ক্যাম্পের বিভিন্ন স্থানে জড়ো হন। বিশাল এই বসতি জুড়ে বেশ কয়েকটি ছোট-বড় জামাত অনুষ্ঠিত হয়। তবে এসব আয়োজনও তাদের দেশত্যাগের বেদনাকে আড়াল করতে পারেনি।
উখিয়ার থাইনখালি ক্যাম্পের বাসিন্দা আজিজুর রহমান বলেন, `খাঁচায় বন্দি পশুর মতো আমাদের ঈদ কাটে চোখের জলে। নামাজের পর আমরা আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করেছি, আমাদের জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার জন্য মিনতি করেছি। গত আট বছর ধরে এভাবেই আমাদের প্রতিটি ঈদ কাটছে।‘
অল্প পরিসরে অনেক মানুষের বসবাস, দারিদ্র এবং সম্পূর্ণভাবে মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরতার কারণে রোহিঙ্গাদের জীবন অত্যন্ত সীমাবদ্ধ। এবার ঈদ উপলক্ষ্যে বাড়তি কোনো সহায়তা নেই বললেই চলে।
মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা মৌসুমি সাহায্য পাঠালেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য। ক্যাম্পের সূত্রমতে, প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা পরিবারের মধ্যে উৎসবের সময় বাড়তি রসদ পেয়েছে বড়জোর অর্ধেক পরিবার।
বাংলাদেশের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মিজানুর রহমান এই চাপের কথা স্বীকার করে বলেন যে, `শরণার্থীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় সীমিত সম্পদের ওপর তীব্র চাপ তৈরি হচ্ছে।‘
এই সংখ্যা বৃদ্ধির কারণ কেবল দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি নয়, বরং মিয়ানমারের ভেতরে নতুন করে শুরু হওয়া সহিংসতা।
বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র শ্যারি নিজম্যানের মতে, ২০১৭ সালের বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা প্রবেশের পর থেকে এখন ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী কক্সবাজারে বসবাস করছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার এবং জনগণ অসাধারণ প্রতিশ্রুতি ও মানবিকতা দেখিয়েছে।
তবে তিনি এটাও সতর্ক করে বলেন যে, সংকট শেষ হওয়া এখনো অনেক দূরের বিষয়।

নিজম্যান আরও বলেন, ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে উত্তর রাখাইনে সংঘাত বেড়ে যাওয়ায় অন্তত ১ লাখ ৪৫ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এই নতুন আগতদের জন্য নতুন কোনো জায়গা সৃষ্টি হয়নি, তারা আগে থেকেই জনাকীর্ণ ক্যাম্পগুলোতে জায়গা করে নিচ্ছে। পুরোনোদের সঙ্গেই আশ্রয় আর সীমিত সম্পদ ভাগ করে নিতে হচ্ছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, `রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান রয়েছে মিয়ানমারে। শরণার্থীরা বারবার ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে, কিন্তু তা কেবল তখনই সম্ভব যখন নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং স্থায়িত্ব নিশ্চিত হবে।‘
সেই শর্তগুলো এখনও অনুপস্থিত।
চলমান সহিংসতা, পদ্ধতিগত নিপীড়ন এবং নিরাপত্তাহীনতা প্রত্যাবাসনের যেকোনো বাস্তবসম্মত সম্ভাবনাকে আটকে দিচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আরাকান আর্মির কর্মকাণ্ড উত্তর রাখাইন জুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। যা নতুন করে বাস্তুচ্যুতি ঘটাচ্ছে।
একই সময়ে বিশ্বব্যাপী তহবিল কমে যাওয়ায় মানবিক কার্যক্রম চাপের মুখে পড়েছে। সাহায্য সংস্থাগুলো বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে ২০২৬ সালের ‘জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান’ চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সেখানে নতুন আগতসহ প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার সহায়তার জন্য ৭১০ মিলিয়ন ডলার চাওয়া হয়েছে। রোহিঙ্গাদের জন্য প্রয়োজন থাকলেও গত বছরের তুলনায় এই আবেদনের পরিমাণ ২৬ শতাংশ কমানো হয়েছে।
তহবিলের এই ঘাটতি খাদ্য সহায়তা থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষার মতো প্রয়োজনীয় পরিষেবাগুলোর স্থায়িত্ব নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করেছে। শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সমর্থন ছাড়া ক্যাম্পের পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নিজম্যান কেবল জরুরি সহায়তার বাইরে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
তিনি বলেন, `রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কেবল সহায়তাই নয়, সুযোগও প্রয়োজন—যাতে তারা সহনশীলতা এবং দক্ষতা অর্জন করতে পারে। যা তাদের কমতে থাকা সাহায্যের সঙ্গে মানিয়ে নিতে এবং চূড়ান্ত প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করবে।‘
সংকট পরিস্থিতি স্পষ্ট হয় নতুন করে বাংলাদেশে প্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের গল্পে।
এই মাসের শুরুর দিকে রাখাইনের মংডু থেকে এক রোহিঙ্গা পরিবার পালিয়ে আসে এবং পাচারকারীদের সহায়তায় টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের কাছে সমুদ্রপথ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এই যাত্রার জন্য তারা প্রায় ৭০ লাখ কিয়াট (যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ লাখ টাকা) পরিশোধ করেছে।
দুই নারী ও তিন শিশুসহ ছয় সদস্যের ওই পরিবারটি উখিয়ার একটি ক্যাম্পে স্বজনদের কাছে আশ্রয় নিয়েছে। ক্যাম্প-ইন-চার্জ ও উপ-সচিব আজগর আলী তাদের আসার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান যে, কর্তৃপক্ষ বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।
এ ধরনের ঘটনা একটি রূঢ় বাস্তবতাকেই ফুটিয়ে তোলে। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী জনগোষ্ঠীকে সামলাতে হিমশিম খেলেও, সহিংসতা থেকে বাঁচতে মরিয়া মানুষের প্রবাহ থামার কোনো লক্ষণ নেই।
মিয়ানমারে ঈদ উদযাপনের সম্ভাবনা নিয়ে গত বছরের সেই আশাবাদের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিয়ানমার ডেস্কের মহাপরিচালক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই কর্মকর্তা জানান যে, সরকার এই সংকটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত এবং এর চারপাশের জটিল বাস্তবতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন।
রোহিঙ্গাদের কাছে এই ঈদ কোনো উদযাপন নয়, এটি বাস্তুচ্যুতির এক নির্মম অনুস্মারক, ভঙ্গুর প্রতিশ্রুতির খতিয়ান এবং নাগালের বাইরে থাকা নিজ ভূমির জন্য দীর্ঘশ্বাস।
যতক্ষণ না মিয়ানমারের পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন ঘটবে এবং প্রত্যাবাসনের একটি বিশ্বাসযোগ্য পথ তৈরি হবে, ততক্ষণ নিজ বাড়িতে ঈদ উদযাপনের বিষয়টি কেবল একটি অপূর্ণ আশাই হয়ে থাকবে।


