একটা সময় ছিল, যখন মোস্তাফিজুর রহমান বল করতে এলেই মনে হতো, ‘এই বুঝি কিছু একটা হলো।’
শনিবার ঠিক একই রকম অনুভূতি দিলেন লেগ স্পিনার রিশাদ হোসেন। মিরপুরের কালো চকচকে টার্নিং উইকেটে যেভাবে ক্যারিবিয়ানদের নাচিয়েছেন লেগ স্পিনে, প্রতিটি ডেলিভারিই ছিল ঘটনাবহুল। প্রথম বাংলাদেশি লেগি হিসেবে ঘরের মাঠে পাঁচ উইকেট নিলেন রিশাদ। তার ক্যারিয়ারসেরা বোলিংয়ে ২০৮ রানের লক্ষ্যে খেলতে নামা ওয়েস্ট ইন্ডিজ গুটিয়ে গেল ১৩৩ রানে। ৭৪ রানের এই জয়ে সিরিজ শুরু করল বাংলাদেশ।
অথচ তাদের শুরুটা ছিল দুর্দান্ত। টার্নিং উইকেট হলেও দুই ওপেনার অ্যালিক আথানেজ ও ব্র্যান্ডন কিং শট খেলেছেন শুরু থেকেই, গড়েছেন ৫১ রানের জুটি। সেই জমে যাওয়া জুটিটা ভেঙেছেন রিশাদ। ইনিংসের ১২তম ওভারে নিজের প্রথম ওভার করতে এসেই নেন উইকেট। ঝুলিয়ে দেয়া বলের লাইন মিস করে এলবিডব্লিউ হন আথানেজ।
তিনে নামা কেসি কার্টিকে বারবার অফ স্টাম্পের বাইরে বল দিয়ে ড্রাইভ করতে বাধ্য করেছেন। আর সেখানেই করেছেন বাজিমাৎ। ইনিংসের ২০-তম ওভারে তেমনই এক টার্নিং বলে ড্রাইভ করে স্লিপে সাইফ হাসানের হাতে ক্যাচ দিয়েছেন কার্টি। প্রথম স্পেলে করেছেন টানা ছয় ওভার। স্পেলের পঞ্চম ওভারে সাবলীল ব্যাট করতে থাকা কিং আউট হয়েছেন দারুণ এক লেগ ব্রেকে। ব্যাটের কানা ছুঁয়ে বল জমা পড়ে উইকেটকিপার নুরুল হাসান সোহানের হাতে। প্রথম দফায় বল গ্লাভসে জমাতে না পারলেও সামনে ডাইভ করে দারুণ এক ক্যাচ ধরেন সোহান। সেই ওভারেই রিশাদ নেন আরো একটা উইকেট, একইভাবে সোহানের হাতে ক্যাচ দেন শারফেন রাদারফোর্ড।
রিশাদের ওয়ানডে ক্যারিয়ারের প্রথম ফাইফার এসেছে উইন্ডিজ শারফেন রাদারফোর্ডকে ফিরিয়ে। তার টার্ন করে বেরিয়ে যাওয়া বল, ব্যাটের কানা ছুঁয়ে সোজা সোহানের গ্লাভসে। অনফিল্ড কল নট আউট হলেও রিভিউ নেয়ার পর আল্ট্রা এজে দেখা যায় ব্যাটের কানায় লেগেছে বল। শেষ ব্যাটার জেইডেন সিলসকে আউট করে রিশাদ বোলিং শেষ করেছেন ৯-০-৩৫-৬ ফিগার নিয়ে।
রিশাদের জাদুকরী সন্ধ্যায় উইকেট তালিকায় নিজেদের নাম খুঁজে পেয়েছেন মিরাজ, তানভীর ইসলাম ও মোস্তাফিজুর। ক্যারিবিয়ানদের শেষ ভরসা হয়ে থাকা রোমারিও শেফার্ড ধন্দে পড়ে মিড অফে মোস্তাফিজের হাতে ক্যাচ দিয়েছেন এই ডানহাতি ব্যাটার। বাঁহাতি এই পেসারের দ্বিতীয় শিকার গ্রিভস।
২৯৮ বলের মধ্যে ১৮৩টিই ডট। টসে হেরে আগে ব্যাট করতে নামা বাংলাদেশের সংগ্রহ যে কোনোভাবে ২০০ পেরিয়েছে, অবদান পুরোটাই রিশাদের। ১৩ বলে খেলেছেন ২৬ রানের ইনিংস। বাংলাদেশের প্রথম ছক্কাটাও এসেছে তার ব্যাট থেকেই। জাস্টিন গ্রিভসের কাটারকে তুলে মেরেছেন লং অনে। এক ওভার পর জেইডেন সিলসের বাউন্সার পুল করে নিয়ে ফেলেছেন মিড উইকেটের ওপারে।
তবে এর আগে বাংলাদেশি ব্যাটাররা যা দেখিয়েছেন তা দেখে দর্শকরাও যারপরনাই বিরক্ত হয়েছেন। একটা পর্যায়ে চার-ছক্কায় যে পরিমাণ উল্লাস হয়েছে, তার চেয়ে বাংলাদেশি ব্যাটাররা আউট হলে বরং সেটা উদযাপন করেছেন বেশি। ইনিংসের শেষ দিকে অভিষিক্ত মাহিদুল ইসলাম বোল্ড হয়েছেন রস্টন চেইজের বলে। তখন যত জোরে চিৎকার আর হাততালির আওয়াজ শোনা গেছে, শব্দের ডেসিবলে সেটাই ছিল হয়তো সর্বোচ্চ।
এর পেছনে বাংলাদেশের ব্যাটারদের ওই অতি সাবধানী এপ্রোচটাই দায়ী। হ্যাঁ, নতুন উইকেটে শুরুর দিকে বাউন্স ছিল, ম্যাচের দৈর্ঘ্য বাড়ার সাথে সাথে স্পিনাররা বড় টার্ন পেয়েছেন। তবে স্পিন ভালো খেলার সুখ্যাতি থাকা নাজমুল হোসেন শান্ত, মেহেদী হাসান মিরাজদের ব্যাটিং সেটাকে আরো দৃষ্টিকটু একইসাথে উইন্ডিজের স্পিনারদের দুর্বোধ্য করে তুলেছিল। উইন্ডিজের তিন স্পিনার খারি পিয়েরে, রস্টন চেইজ ও গুদাকেশ মোতি যথাক্রমে ডট দিয়েছেন ৪৬, ৩৭ ও ৩৩টি করে। তিনজনই বল করেছে ন ১০ ওভার করে।
তাদের স্পিন জাদুতেই পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। অবশ্য এক্ষেত্রে ডিফেন্সিভ ব্যাটিংই ছিল দায়ী। নইলে মিরপুরের চেনা স্পিন রাজ্যে কেন এত বিরক্তিকর ব্যাটিং করবে বাংলাদেশ? ৮ রানের মধ্যে দুই ওপেনার সাইফ হাসান ও দীর্ঘদিন পর ওয়ানডেতে ফেরা সৌম্য সরকার ফেরার পর তৃতীয় উইকেটে ৭১ রানের একটা জুটি গড়েন শান্ত ও তাওহিদ হৃদয়। কিন্তু তাদের ব্যাটিংয়ে না ছিল যথাযথ এপ্রোচ, না ছিল ইনিংস বড় করার ইন্টেন্ট। অথচ দুজন মিলে খেলেছেন ১২০ রানের জুটি। এতক্ষণ উইকেটে থেকেও কেন স্পিন আর টার্নের সাথে মানিয়ে নিতে পারলেন না, সেই প্রশ্নও তোলা যায় চাইলে।
৬৩ বলে ৩২ রান করে শান্ত ফিরেছেন পিয়েরের বলে এলবিডব্লিউ হয়ে। ১১-তম ওয়ানডে ফিফটি ছুঁয়ে হৃদয় উইকেট দিয়েছেন পেসার গ্রিভসকে। প্রথম ওয়ানডে খেলতে নামা মাহিদুলও ফিরেছেন ফিফটির দ্বারপ্রান্তে থেকে। ৭৬ বলে ৪৬ রান করেছেন এই ডানহাতি ব্যাটার। এর আগে অধিনায়ক মিরাজ ফিরেছেন চেইজকে স্লগ সুইপ করে ফাইনা লেগে ক্যাচ দিয়ে। ১০ বলে ৯ রান করা সোহান, স্লোয়ারে লফটেড শট খেলে উইকেট দিয়েছেন গ্রিভসকে। তিন উইকেট নিয়েছেন সিলস। দুটি করে উইকেট নিয়েছেন চেইজ ও গ্রিভস। একটি করে উইকেট নেন রোমারিও শেফার্ড ও পিয়েরে।


