একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আধুনিক নগরায়ন বলতে শুধু সুউচ্চ অট্টালিকা বোঝায় না, বরং নাগরিক সেবার সহজলভ্যতাকে বোঝায়। বর্তমানে রাজধানী ঢাকা আজ বিশ্বের অন্যতম জনবহুল এবং ব্যস্ততম মেগাসিটি। দুই কোটিরও বেশি মানুষ এই শহরে প্রতিদিন জীবনযুদ্ধ করে বেঁচে থাকে। বর্তমানে এই নগরীতে নাগরিক সেবা পাওয়া খুবই চ্যালেঞ্জিং। বর্তমানে একজন নাগরিককে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, হোল্ডিং ট্যাক্স বা ট্রেড লাইসেন্সের মতো সাধারণ সেবার জন্য ভিন্ন ভিন্ন অফিসে দৌঁড়াতে হয়।
নাগরিকের ভোগান্তি কমাতে এবং শহরের যানজট নিয়ন্ত্রণে এক ছাতা বা ইউনিফাইড সার্ভিস পয়েন্ট এখন সময়ের দাবি। গবেষণায় দেখা গেছে, যানজটের কারণে ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয় ও প্রায় ৫০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়, যা নাগরিকের জীবনযাত্রায় ব্যয় হলে জীবনমানই পরিবর্তন হয়ে যেতো। (আর্থিক ক্ষতি জিডিপির প্রায় ২.৯%)
সেবার খোঁজে যখন একজন নাগরিককে সচিবালয় থেকে মতিঝিল, আর মতিঝিল থেকে উত্তরার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ছুটতে হয়, তখন যানজট আরও প্রকট আকার ধারণ করে। সকল সেবা এক জায়গায় থাকলে রাস্তায় মানুষের চলাচল কমবে। পাশাপাশি মানুষের দুর্ভোগ কমবে। গত এক দশকে ঢাকার রাস্তায় যানবাহনের গড় গতিবেগ ২১ কিমি/ঘণ্টা থেকে নেমে বর্তমানে ৪.৫ কিমি/ঘণ্টায় এসে দাঁড়িয়েছে, যা মানুষের হাঁটার গতির প্রায় সমান।
সেবা গ্রহীতার সরাসরি অফিসে উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তা এবং জটিল প্রক্রিয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট বৃদ্ধি পায়, যা স্বচ্ছতা নষ্ট করে, জনদুর্ভোগ ও দুর্নীতির হার বাড়ায়। এছাড়া সমন্বয়হীনতার একটি বড় উদাহরণ হলো রাস্তা খনন। দেখা যায়, সিটি কর্পোরেশন রাস্তা করার পরপরই ওয়াসা বা তিতাস সেটি পুনরায় খনন করছে। একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম থাকলে এই জাতীয় অপচয় রোধ করা সম্ভব।
বর্তমানে ঢাকা মহানগরীর নাগরিক সেবা প্রদানের জন্য প্রায় ৪০টিরও বেশি সরকারি সংস্থা কাজ করছে। এই সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব প্রকট। ওয়াসা, ডেসকো এবং সিটি কর্পোরেশনের মতো সংস্থাগুলো আলাদা আলাদা ভাবে কাজ করায় সাধারণ মানুষকে প্রতিটি ছোট কাজের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ফরম পূরণ এবং দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়।
মৌলিক সেবাসমূহ:
১. নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ ও বিল পরিশোধ (ডেসকো/ডিপিডিসি)।
২. পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন সেবা (ঢাকা ওয়াসা)।
৩. গ্যাস সংযোগ ও প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থাপনা (তিতাস)।
৪. ইন্টারনাল ড্রেনেজ পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ।
প্রশাসনিক সেবাসমূহ:
৫. হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ ও অনলাইন পেমেন্ট।
৬. ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়ন।
৭. জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন সনদ।
৮. ওয়ারিশান ও চারিত্রিক সনদপত্র।
৯. ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদন (রাজউক ও সিটি কর্পোরেশন সমন্বয়)।
১০. গৃহপালিত পশুর লাইসেন্স ও টিকাদান।
পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতা সেবাসমূহ:
১১. বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ময়লা সংগ্রহের শিডিউল ট্র্যাকিং।
১২. পাবলিক টয়লেট ও স্যানিটেশন ম্যাপ।
১৩. মশা নিধন ও ফগিং কার্যক্রমের এলাকাভিত্তিক তথ্য।
১৪. পার্ক ও খেলার মাঠ রক্ষণাবেক্ষণের আবেদন।
১৫. বৃক্ষরোপণ ও নগর বনায়ন কর্মসূচি।
পরিবহন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সেবাসমূহ:
১৬. ডিজিটাল পার্কিং স্পেস বুকিং।
১৭. বিআরটিএ সেবা (ড্রাইভিং লাইসেন্স ও ফিটনেস)।
১৮. গণপরিবহনের রুট পারমিট ও ই-টিকিটিং।
১৯. ট্রাফিক জ্যাম আপডেট ও বিকল্প রাস্তার পরামর্শ।
২০. বাইসাইকেল লেনের নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা।
জনস্বাস্থ্য ও জরুরি সেবা সেবাসমূহ:
২১. কমিউনিটি ক্লিনিক ও সরকারি হাসপাতালের অ্যাপয়েন্টমেন্ট।
২২. অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি রক্ত সহায়তা।
২৩. ফায়ার সার্ভিস ও অগ্নিনির্বাপণ তদারকি।
২৪. ওষুধের দোকান ও জরুরি ফার্মেসির ডাটাবেজ।
২৫. খাদ্য পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ও ভেজাল বিরোধী অভিযোগ।
সামাজিক নিরাপত্তা ও শিক্ষা সেবাসমূহ:
২৬. বয়স্ক ভাতা ও সামাজিক সুরক্ষা কার্ড।
২৭. সরকারি স্কুল ও কলেজের ভর্তি তথ্য।
২৮. পাবলিক লাইব্রেরি ও রিডিং রুম এক্সেস।
২৯. ডে-কেয়ার সেন্টার ও শিশু যত্ন কেন্দ্র।
৩০. বেকার যুবকদের কারিগরি প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান ব্যাংক।
নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তা সেবাসমূহ:
৩১. এলাকাভিত্তিক সিসিটিভি সার্ভেইল্যান্স এক্সেস (সীমিত)।
৩২. অনলাইন জিডি ও আইনি সহায়তা সেল।
৩৩. ইভটিজিং ও সাইবার ক্রাইম রিপোর্ট পোর্টাল।
৩৪. দুর্যোগকালীন আশ্রয়কেন্দ্রের অবস্থান।
অন্যান্য নাগরিক সেবাসমূহ:
৩৫. হকার ও ফুটপাত ব্যবস্থাপনা লাইসেন্স।
৩৬. বিজ্ঞাপন ও সাইনবোর্ড প্রদর্শনের অনুমতি।
৩৭. মেলা ও সামাজিক অনুষ্ঠানের স্থান বরাদ্দ।
৩৮. কবরস্থান ও শ্মশান ব্যবস্থাপনা।
৩৯. রাস্তার বাতি মেরামতের অভিযোগ।
৪০. নাগরিক মতামত ও সরাসরি মেয়রকে বার্তা পাঠানোর ব্যবস্থা।
এসব গুরুত্বপূর্ণ সেবাখাতসমূহ একটি প্ল্যাটফর্মে থাকলে আধুনিক ও বাসযোগ্য ঢাকা গড়ার পথে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। এর ফলে একদিকে নাগরিক ভোগান্তি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে। অন্যদিকে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। একটি সমন্বিত ডিজিটাল ইন্টারফেসের মাধ্যমে ঢাকার প্রতিটি মানুষ হাতের মুঠোয় প্রয়োজনীয় সেবা পাবেন। এর ফলে সময়ের সাশ্রয় হবে এবং নগর ব্যবস্থাপনায় আসবে গতিশীলতা।
প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি নির্দিষ্ট প্রোফাইল থাকবে, যেখান থেকে NID ব্যবহার করে বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস এবং কর সংক্রান্ত সব কাজ সম্পন্ন করা যাবে। যারা ইন্টারনেটে অভ্যস্ত নন, তাদের জন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে ‘সেবা কেন্দ্র’ থাকবে যেখানে সব সরকারি ফরম ও সহায়তা পাওয়া যাবে। এজন্য ওয়াসা, ডেসকো, তিতাস এবং সিটি কর্পোরেশন এর ৪০টিরও বেশি সেবাকে একটি কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেলের আওতায় আনতে হবে।
এক ছাতা বা সমন্বিত প্ল্যাটফর্মের রূপরেখা
একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য ঢাকা গড়তে নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা অপরিহার্য।
প্রথমত: প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি নির্দিষ্ট প্রোফাইল থাকবে, যা তার জাতীয় পরিচয়পত্র- এর সাথে লিঙ্ক করা থাকবে। এই একটি পোর্টাল থেকেই বিদ্যুৎ বিল প্রদান, পানির সংযোগের আবেদন, হোল্ডিং ট্যাক্স জমা এবং ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করা যাবে। এতে করে মানুষকে সশরীরে অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন পড়বে না, যা রাস্তায় যানবাহনের চাপ অনেকাংশে কমিয়ে দেবে।
দ্বিতীয়ত: যারা ইন্টারনেট ব্যবহারে দক্ষ নন বা সরাসরি সহায়তা প্রয়োজন, তাদের জন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে ডিজিটাল সেবা কেন্দ্র থাকবে। এই কেন্দ্রগুলো হবে ওয়ান-স্টপ সলিউশন। এখানে সব সরকারি ফরম ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ পাওয়া যাবে।
তৃতীয়ত: ওয়াসা, ডেসকো, তিতাস এবং সিটি কর্পোরেশনের সেবাকে একটি কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেলের আওতায় আনতে হবে। এতে প্রতিটি আবেদনের অগ্রগতি ট্র্যাক করা যাবে এবং কোনো ফাইল নির্দিষ্ট সময়ের বেশি পড়ে থাকলে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা হবে।
চতুর্থত: বিশ্বের অনেক মেগাসিটি এই সমন্বিত মডেল ব্যবহার করে সফল হয়েছে। যেমন সিঙ্গাপুর Singpass অ্যাপের মাধ্যমে সেবাসমূহ প্রদান করা হয় যার ফলে সিঙ্গাপুরের জনগণকে কোন ভোগান্তিতে পড়তে হয় না। এস্তোনিয়াতে ৯৯% সরকারি সেবা অনলাইনে পাওয়া যায়। যার ফলে দেশটিতে বছরে প্রায় ৮০০ বছরের সমান কর্মঘণ্টা সাশ্রয় হয় এবং লন্ডন ‘Greater London Authority’ এর মাধ্যমে শহরের সকল সেবা এবং পরিবহন ব্যবস্থার সমন্বয় করা হয়।
পঞ্চমত: এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে ঢাকা শহর বহুমুখী সুবিধা ভোগ করবে যানজট হ্রাস: অন্তত ২০% মানুষ যারা শুধুমাত্র কাগজের কাজ বা বিল জমা দিতে বাইরে বের হন, তাদের যাতায়াত কমে যাবে। যানবাহনের চাপ কমলে বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। যেহেতু সব লেনদেন ডিজিটাল হবে, তাই দুর্নীতির সুযোগ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসবে। দ্রুত ট্রেড লাইসেন্স ও অনুমোদন পাওয়ায় নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে এবং ব্যবসা সহজ হবে।
ঢাকা আজ আর ছোট শহর নয়। এটি একটি আন্তর্জাতিক হাব। রাজধানীকে বাসযোগ্য করতে এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে সকল নাগরিক সেবাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর নিচে নিয়ে আসা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।
একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম মানে কেবল একটি ওয়েবসাইট নয়, এটি হলো কোটি মানুষের দুর্ভোগ থেকে মুক্তির সনদ। আমরা আশা করি, সরকার দ্রুত একটি কার্যকর ও কেন্দ্রীয় নাগরিক সেবা ব্যবস্থা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে, যা আমাদের ঢাকাকে একটি আধুনিক, গতিশীল এবং মানবিক শহরে রূপান্তরিত করবে। মাননীয় সরকারের কাছে আমাদের বিনীত দাবি, ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য করতে এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে সকল নাগরিক সেবাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর নিচে নিয়ে আসুন। এতে মানুষের ভোগান্তি কমবে, স্বচ্ছতা বাড়বে এবং আমরা একটি আধুনিক ও গতিশীল ঢাকা পাব।
লেখক: প্রফেসর বদরুল ইসলাম
শেখ বোরহানুদ্দীন পোস্ট গ্রাজুয়েট কলেজ, ঢাকা


