যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও গাজায় বেসামরিক ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। পাশাপাশি জর্ডান নদীর পশ্চিম তীরে মানবতাবিরোধী অপরাধ করছে—এমনটাই অভিযোগ করেছে জাতিসংঘের একটি মানবাধিকার কমিশন।
গত ২৬ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে উপস্থাপন করা জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনের এই প্রতিবেদনে গাজা ও ফিলিস্তিনের জাতীয় কর্তৃপক্ষের মধ্যকার সহিংসতার পেছনের কারণগুলো খতিয়ে দেখা হয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, স্বাধীন এ তদন্ত কমিশনের তথ্য বলছে, ইসরায়েলি বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে ফিলিস্তিনি শিশুদের নিশানা করছে। ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত করা এবং নিয়ন্ত্রণে রাখার বৃহত্তর অভিযানের অংশ হিসেবে নির্যাতন, ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা চালানো হচ্ছে।
২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ ও স্নাইপারদের গুলিতে ১ হাজার ৪৩১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩০০ শিশু রয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিষ্ঠিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর গত মে মাসের সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছিল যে যুদ্ধবিরতি ‘বড় আকারে বজায় রয়েছে’।
গণহত্যার অভিপ্রায়ের প্রমাণ
গাজায় ফিলিস্তিনিদের পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার স্পষ্ট অভিপ্রায়ের প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। দক্ষিণ আফ্রিকার করা গণহত্যার অভিযোগের বিষয়ে হেগের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায় আসার আগপর্যন্ত সংঘাত চলাকালে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে এটিকে সবচেয়ে প্রামাণ্য আইনি বিশ্লেষণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
কমিশনের চেয়ারম্যান ও ভারতীয় আইনজীবী শ্রীনিবাসন মুরালিধর প্রতিবেদনটির সঙ্গে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলেন, পশ্চিম তীরে ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক মানুষকে হত্যা ও আহত করা, বাড়িঘর ধ্বংস এবং এসবের দায় ইসরায়েলের ক্রমাগত অস্বীকার—সবই একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ। এর লক্ষ্য ফিলিস্তিনিদের নির্মূল ও বাস্তুচ্যুত করা এবং তাদের ওপর বসবাসের অযোগ্য পরিস্থিতি চাপিয়ে দেওয়া।
যৌন সহিংসতা ও নিপীড়ন
সর্বশেষ প্রতিবেদনে শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা, মানসিক ক্ষতি ও গুরুতর আহত করার মাধ্যমে ‘বয়সের ভিত্তিতে নিপীড়নের’ বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৫ সালের মার্চে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের পর থেকে গাজা ও পশ্চিম তীরের আটক ব্যক্তিদের ওপর সংঘটিত যৌন সহিংসতার যাচাই করা ঘটনাও এতে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দলবদ্ধ ধর্ষণ, দেহের গোপন অঙ্গে তল্লাশি, জোর করে বিবস্ত্র করা এবং যৌন উদ্দেশ্যে শরীরে হাত দেওয়া।
গাজার ওপর ইসরায়েলি অবরোধ ভাঙার চেষ্টায় যাওয়া ৫০টি নৌযানের একটি বহর ভূমধ্যসাগরে আটক করা হয়। ওই বহরের অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার দুটি ঘটনাও তদন্ত করেছে কমিশন।
পশ্চিম তীরে সংঘাতের তীব্রতা
পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী ক্রমবর্ধমানভাবে তীব্র বলপ্রয়োগ করছে। যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে তারা ১ হাজার ৮০ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে।
কমিশন উল্লেখ করেছে যে, বেসামরিক লোকজনের ওপর ব্যাপকভাবে ও সুপরিকল্পিত আক্রমণের অংশ হিসেবে ক্রমবর্ধমান বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনী মোট হত্যার ৯৫ শতাংশ এবং আহতের ৮২ শতাংশের জন্য দায়ী, যা যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল।
তাছাড়া, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সামরিক অভিযানের কারণে ২০২৬ সালের আগস্টের মধ্যে ৩৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় ইসরায়েল জর্ডানের কাছ থেকে ভূখণ্ডটি দখল করার পর থেকে পশ্চিম তীরে এটিই সবচেয়ে বড়ো বাস্তুচ্যুতির ঘটনা।
চলতি মাসের এক সাম্প্রতিক ঘটনায়, পশ্চিম তীরের আবু ফালাহ গ্রামে ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে আহত এক স্থানীয় পরিষদ সদস্যকে চিকিৎসকরা উদ্ধার করে হাসপাতালে নেন।
ইসরায়েলের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান
ইসরায়েল অবিলম্বে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। জেনেভায় জাতিসংঘের স্থায়ী মিশন এই প্রতিবেদনকে দেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর উদ্দেশ্যে তৈরি করা ভুয়া তথ্য বলে অভিহিত করেছে।
জেনেভায় নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল মেরন এমন তদন্ত কমিশনের প্রচেষ্টার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, এসব সংস্থা ইসরায়েলের বৈধতা ক্ষুণ্ন করতে এবং এর অস্তিত্ব ও আত্মরক্ষার অধিকারকে অস্বীকার করার চেষ্টা করছে।
প্রতিবেদনটিতে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষেরও (পিএ) সমালোচনা করা হয়েছে। অধিকৃত পশ্চিম তীরের কিছু অংশ পরিচালনাকারী এই কর্তৃপক্ষ ওয়ান্টেড ফিলিস্তিনিদের নিশানা করতে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বিতভাবে পরিচালিত অভিযানে অতিরিক্ত মাত্রায় মারাত্মক বলপ্রয়োগ করেছে।
২০২৫ সালের অক্টোবরের আগের প্রায় দুই বছরে এই যৌথ অভিযানের ফলে অন্তত ১৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। প্যানেল আরও যোগ করেছে যে, এই প্রশাসন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমনে মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের নিশানা বানিয়ে সমালোচনার কঠোর জবাব দিয়েছে।
জেনেভায় জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত ইব্রাহিম খরাইশি এর জবাবে জানিয়েছেন যে, কর্তৃপক্ষ মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সম্মান জানিয়ে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং যেকোনো অসদাচরণের বিচার করা হবে।


