ইসরায়েলের নির্বাচনে আবারও প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হতে যাচ্ছে। ভোটের ফলেই স্পষ্ট হবে, তিনি ক্ষমতায় থাকতে পারবেন কি না, নাকি বিরোধীরা নতুন সরকার গঠনের সুযোগ পাবে। তবে ভোট শেষ হলেই যে নতুন সরকারের চিত্র পরিষ্কার হয়ে যাবে, এমন নয়। কোনো দল বা জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে সরকার গঠন নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা চলতে পারে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন ইসরায়েলিরা। ওই হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধ শুরু হয়। তিন বছর পরের এই নির্বাচন নির্ধারণ করবে, দেশটির রাজনীতি কোন পথে এগোবে।
নির্বাচন হচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি হামলা ও নির্যাতন বেড়েছে। গত তিন বছরে ইসরায়েলের হামলার শিকার কয়েকটি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে দেশটির উত্তেজনাও বেড়েছে।
দেশের ভেতরেও নেতানিয়াহুকে নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। ৭ অক্টোবরের হামলা ঠেকাতে সরকারের কথিত ব্যর্থতা, গাজায় নিয়ে যাওয়া জিম্মিদের ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা, দুর্নীতির অভিযোগ এবং অতি অর্থোডক্স ইহুদিদের সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়া নিয়ে বিরোধ নির্বাচনের আগে আলোচনায় এসেছে।
শুক্রবার প্রকাশিত সর্বশেষ জনমত জরিপে দেখা গেছে, নেতানিয়াহুর জোট বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে রয়েছে অথবা কিছুটা পিছিয়ে আছে। বিরোধী জোটের নেতৃত্বে রয়েছেন ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর সাবেক প্রধান গাদি আইজেনকোট।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের জরিপের গড় হিসাব প্রকাশ করেছে। শুক্রবার পর্যন্ত চ্যানেল ১১, ১২ ও ১৩-এর জরিপের গড় অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর জোট ৫০টি আসন পেতে পারে। আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেতে পারে ৫৪টি আসন।
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে মোট আসন ১২০টি। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে কোনো দল বা জোটের প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসন।
নির্বাচনের ফল কখন জানা যাবে, কীভাবে ভোট গণনা হবে এবং এরপর সরকার গঠন করবেন কে, তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর উত্তর নিচে দেওয়া হলো।
ইসরায়েলে ভোট কখন শেষ হবে?
মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। শেষ হবে রাত ১০টায়। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই ইসরায়েলের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বুথফেরত জরিপের ফল প্রকাশ করবে।
দেশটিতে প্রায় ৭৩ লাখ মানুষ ভোটার। তাদের মধ্যে প্রায় ১২ লাখ ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরায়েলি নাগরিকও রয়েছেন।
বিদেশে বসবাসকারী ইসরায়েলিরা ভোট দিতে পারবেন না। ভোট দেওয়ার জন্য তাদের নির্বাচনের দিন ইসরায়েলে সশরীরে উপস্থিত থাকতে হয়। তবে কূটনীতিক ও রাষ্ট্রীয় দূতেরা এর ব্যতিক্রম। তারা ২০ অক্টোবর ইসরায়েলি মিশনগুলোতে ভোট দিয়েছেন।
নির্বাচনের ফল কবে জানা যাবে?
ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বুথফেরত জরিপ থেকে ফলের প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যেতে পারে। এরপর ভোট গণনার সঙ্গে সঙ্গে আরও স্পষ্ট হবে কোন দল বা জোট কতটি আসন পেতে পারে।
তবে কোনো দল বা জোট স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে চূড়ান্ত ফলের পাশাপাশি সরকার গঠনের চিত্রও পরিষ্কার হতে সময় লাগবে। এ ক্ষেত্রে কয়েক দিন, এমনকি কয়েক সপ্তাহও অপেক্ষা করতে হতে পারে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩০ অক্টোবরের মধ্যে ভোট গণনা শেষ হওয়ার কথা। নির্বাচনের এক সপ্তাহ পর, ৪ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হবে। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটেও সরাসরি ফল দেখা যাবে।
তবে ভোটের ফল জানা আর নতুন সরকার গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া এক নয়। কোনো দল বা জোট ৬১টি আসন না পেলে সরকার গঠনের জন্য অন্য দলগুলোর সমর্থন জোগাড় করতে হবে। ফলে নির্বাচনের পরও রাজনৈতিক আলোচনা চলতে পারে কয়েক সপ্তাহ।
ইসরায়েলের নির্বাচনী ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে?
ইসরায়েলে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে নির্বাচন হয়। অর্থাৎ, ভোটাররা কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীকে নয়, রাজনৈতিক দলকে ভোট দেন। জাতীয় পর্যায়ে কোনো দল যত শতাংশ ভোট পায়, পার্লামেন্টে তাদের আসনসংখ্যা সাধারণত সেই অনুপাতের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, লিকুদ পার্টি জাতীয় ভোটের ৫০ শতাংশ পেলে ১২০ আসনের নেসেটে আনুপাতিক হিসাবে প্রায় ৬০টি আসন পেতে পারে।
পার্লামেন্টে আসন পেতে কোনো দলকে জাতীয় ভোটের অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ পেতে হবে। এই সীমার নিচে থাকলে দলটি নেসেটে কোনো আসন পাবে না।
প্রায় এক ডজন দল এই ন্যূনতম ভোটের সীমা পার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই সব ভোট গণনা করে আসন বণ্টনের চূড়ান্ত হিসাব তৈরি করতে সময় লাগতে পারে।
সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। কিন্তু ভোটের অনুপাতে আসন বণ্টন হওয়ায় কোনো একটি দলের পক্ষে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া কঠিন। এ কারণে একাধিক দল মিলে জোট সরকার গঠন করে।
পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কীভাবে নির্বাচিত হবেন?
ভোট গণনা ও চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। তারা কাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান, তা জানার পর প্রেসিডেন্ট এমন একজনকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন, যার পক্ষে প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগাড় করার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে তিনি মনে করেন। মনোনীত ব্যক্তি সরকার গঠনের জন্য সর্বোচ্চ ৪২ দিন সময় পাবেন।
ইসরায়েলে এখন পর্যন্ত কোনো একক দল একা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। তাই সরকার গঠনের জন্য একাধিক দলের সমর্থন প্রয়োজন হয়। কোন দল কার সঙ্গে জোট করবে, কে প্রধানমন্ত্রী হবেন এবং সরকার কীভাবে চলবে, তা নিয়ে আলোচনা করতে প্রায়ই কয়েক সপ্তাহ লেগে যায়।
এ ক্ষেত্রে ছোট দলগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাদের সমর্থন ছাড়া বড় কোনো জোটের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন কঠিন হতে পারে।
নেতানিয়াহু বা তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা সরকার গঠন করতে না পারলে কী হবে?
প্রথম মনোনীত ব্যক্তি সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে অন্য কাউকে সেই সুযোগ দেওয়া হতে পারে। এ সময় ছোট দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের বিভিন্ন পথ খোলা থাকবে।
এর মধ্যে রয়েছে সংখ্যালঘু সরকার গঠন অথবা ক্ষমতা ভাগাভাগির চুক্তি করা। এমন চুক্তিতে দুই রাজনৈতিক নেতা পালাক্রমে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করতে পারেন।
তবে কোনো পক্ষই যদি কার্যকর সরকার গঠনের মতো সমর্থন জোগাড় করতে না পারে, তাহলে নতুন নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে। সে পর্যন্ত নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন বর্তমান মন্ত্রিসভা তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা ও রয়টার্স


