সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে শুধু আইন প্রণয়ন বা চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যথেষ্ট নয়। এর জন্য নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো, যানবাহনের নিরাপত্তা, গতি নিয়ন্ত্রণ, চালকের প্রশিক্ষণ এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর দায়িত্ব নির্ধারণ, কার্যকর সমন্বয় ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আয়োজিত ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন: বর্তমান প্রেক্ষিত ও সরকারের অঙ্গীকার’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
এ সময় বক্তারা চালকের দক্ষতা বৃদ্ধি, যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করা, ট্রাফিক আইন মানা, পথচারীর নিরাপত্তা এবং জনসচেতনতা বাড়াতে ধারাবাহিক উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। তাদের মতে, সরকারি সংস্থা, পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠন, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের সমন্বিত অংশগ্রহণ ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর উদ্যোগ টেকসই হবে না।
বুয়েটের অধ্যাপক ও সড়ক বিশেষজ্ঞ শামসুল হক বলেন, প্রচলিত পরিবহন আইনে পথচারীসহ অন্যান্য সড়ক ব্যবহারকারীর নিরাপত্তা যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ অনুসরণ করা প্রয়োজন। এ পদ্ধতিতে সড়ক, যানবাহন, গতি নিয়ন্ত্রণ ও সড়ক ব্যবহারকারীর নিরাপত্তার পাশাপাশি দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। এ জন্য একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী সড়ক নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। চালকের ভুলের ওপর সব দায় চাপিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। যানবাহনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি এবং চালকদের অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা কমানোর বিষয়েও উদ্যোগ নিতে হবে।
বৈঠকে দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে শক্তিশালী সড়ক নিরাপত্তা ডেটা সেল গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। বক্তারা বলেন, দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা, দুর্ঘটনার কারণ, হতাহতের সংখ্যা, যানবাহনের ধরন ও সড়কের অবস্থা সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে পরিকল্পনা নেওয়া গেলে দুর্ঘটনা প্রতিরোধের উদ্যোগ কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা মূল্যায়ন করা সহজ হবে।
সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে প্রস্তাবিত সড়ক নিরাপত্তা আইনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব নির্ধারণ, নিয়মিত তদারকি এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রকাশের ব্যবস্থা রাখার পরামর্শ দেন বক্তারা।
জাতিসংঘের সড়ক নিরাপত্তা কর্মদশক ২০২১–২০৩০-এর লক্ষ্য অর্জনে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা, নির্দিষ্ট সময়সীমা ও অগ্রগতি পরিমাপের সূচক নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেন তারা।
কানাডা থেকে ভার্চ্যুয়ালি বক্তব্য দেন নিসচার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিরাজুল মইন জয়। তিনি বলেন, সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নে সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানায় নিসচা। গোলটেবিল বৈঠকের সুপারিশ ও অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে ২০২৭ সালের মধ্যে আইনটি বাস্তবায়িত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
লন্ডনে চিকিৎসাধীন নিসচার প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চনও ভার্চ্যুয়ালি বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, গত ৩৩ বছর ধরে নিসচা সড়ক নিরাপত্তায় জনসচেতনতা তৈরি এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধের দাবিতে কাজ করছে। নিরাপদ সড়কের আন্দোলন কোনো একক ব্যক্তির নয়; এটি দুর্ঘটনায় স্বজন হারানো মানুষ, সংগঠনের কর্মী ও সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল।


