সার্বিয়ায় ক্ষমতাচ্যুত ভুচিচ, দেশ চালাবে শিক্ষার্থীরা

সার্বিয়ায় ক্ষমতাচ্যুত ভুচিচ, দেশ চালাবে শিক্ষার্থীরা
নির্বাচনে জয়ের পর শিক্ষার্থীদের উল্লাস। ছবি: এপি/ইউএনবি
Advertisement
Advertisement

সার্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও দীর্ঘদিনের শাসক আলেকসান্দার ভুচিচকে ক্ষমতাচ্যুত করে ইতিহাস গড়েছে সরকারবিরোধী আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তাদের মনোনীত প্রার্থীরা নির্বাচন জয়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে হেরে গেছেন ভুচিচ। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সরকারবিরোধীরা আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতনে সফল হওয়ার যে স্বপ্ন দেখেন, সার্বিয়ার শিক্ষার্থীরা তা বাস্তবে অর্জন করেছেন।

তবে রোববারের নির্বাচনে জয়ের পর এবার তাদের সামনে এসেছে দেশ পরিচালনার কঠিন বাস্তবতা। শিক্ষার্থীদের পক্ষে যারা নির্বাচনে জয় পেয়েছেন তাদের কারও সরকার পরিচালনার কোনো অভিজ্ঞতা নেই।

রয়টার্সের খবরে বলা হয়,  রোববার রাতে ঐতিহাসিক নির্বাচনে পরাজয় স্বীকার করেন ভুচিচ ও তার নেতৃত্বাধীন জোট। এর মধ্য দিয়ে দুই বছর ধরে চলা শান্তিপূর্ণ সরকারবিরোধী আন্দোলনের সফল পরিণতি ঘটে। তার পরাজয়ের ঘোষণার পর দেশজুড়ে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে বিজয় উদ্‌যাপন করেন।

আনন্দে উদ্বেলিত জনতা আতশবাজি ও আলোর ঝলকানিতে রাজপথ মাতিয়ে তোলেন। চলে গান ও নাচ। তবে এই উচ্ছ্বাসের মধ্যেও সার্বিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে।

নির্দিষ্ট কোনো ‘নেতা’ ছাড়া চলা এই আন্দোলন থেকে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, নতুন সরকারের নীতিই বা কী হবে এবং অতীতে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত না থাকা অপরিচিত প্রার্থীরা কত দিন ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

বিশেষ করে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা, দুর্নীতি নির্মূল এবং জটিল আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সামাল দেওয়ার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন নেতৃত্ব কতটা সফল হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

এসব প্রশ্নের উত্তরের ওপর নির্ভর করছে পশ্চিম বলকান অঞ্চলের বৃহত্তম অর্থনীতি সার্বিয়ার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। একই সঙ্গে চীন, রাশিয়া এবং দেশটির সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্কও অনেকাংশে নির্ধারিত হবে।

রাতভর রাজধানী জুড়ে শিক্ষার্থীদের উদযাপন। ছবি: এপি/ইউএনবি

 

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান টেনিও গ্লোবাল রিসার্চ সোমবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেছে, নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের সমর্থিত প্রার্থীদের এই বিজয়ের ফলে সার্বিয়ায় ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত পরিবর্তনের শুরু হতে পারে। এসব পরিবর্তনের প্রধান লক্ষ্য হবে দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং সরকারি সেবার মানোন্নয়ন।

তবে প্রতিষ্ঠানটি সতর্ক করে বলেছে, সংস্কারের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধ এবং আন্দোলনকারীদের সরকার পরিচালনার সীমিত অভিজ্ঞতা ক্ষমতা হস্তান্তর ও নতুন প্রশাসন গঠনের প্রক্রিয়াকে কঠিন করে তুলতে পারে।

২০২৪ সালে সার্বিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় নোভি সাদ শহরে একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জনের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনার পরই শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে সরকারবিরোধী আন্দোলনের সূচনা হয়। আন্দোলনকারীরা দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের জবাবদিহি এবং দুর্নীতির অবসানের দাবি জানান।

নির্দিষ্ট কোনো প্রধান নেতা না থাকলেও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দেশজুড়ে ব্যাপক জনসমর্থন অর্জন করে। পরে নির্বাচনে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য তারা ২৫০ জন প্রার্থী মনোনীত করেন।

এই প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, চিকিৎসক, অভিনেতা, কৃষক ও সংগীতশিল্পীরা।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং তাদের প্রার্থী তালিকার কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এরইমধ্যে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে কিছু ধারণা দিয়েছেন। তারা দেশের অভ্যন্তরে দুর্নীতিবিরোধী কর্মসূচি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছেন, যার কেন্দ্রে থাকবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক সংস্কার।

আরও পড়ুন

শিক্ষার্থীদের প্রার্থী তালিকার উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন তালিকার শীর্ষে থাকা হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞ ইলিয়া স্রদানোভিচ, দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর দেয়ান শোশকিচ এবং বেলগ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাদোমির শাইচিচ।

নির্বাচনে বিজয়ের পর শিক্ষার্থীদের পক্ষে বক্তব্য দেন অধ্যাপক রাদোমির শাইচিচ। তবে এই ব্যক্তিদের কেউ নতুন সরকারের মন্ত্রী হবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

একইভাবে নির্বাচিত প্রার্থীরা পরস্পরের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি কার্যকর সরকার গঠন করতে পারবেন কি না, সেটিও দেখার বিষয়।

পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পরও প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘ সময় নীতিগত ঐকমত্য ধরে রাখতে হবে তাদের।

নির্বাচনে জয়ের পর শিক্ষার্থীদের উল্লাস। ছবি: এপি/ইউএনবি

 

বেলগ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাতারিনা পপোভিচ বলেন, ‘শিক্ষার্থী আন্দোলন সার্বিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এমন এক পরিবর্তন এনেছে, সেটি কত দিন স্থায়ী হয় এখন দেখার বিষয়। আমরা শুধু আশা করি, তাদের সামনে এমন কিছু বড় লক্ষ্য থাকবে, যা বিদ্যমান ব্যবস্থাকে ভেঙে নতুনভাবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় সময় পর্যন্ত তাদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারবে।’

সার্বিয়ার সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় নির্বাচন কমিশন চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করার পর পার্লামেন্টের অধিবেশন শুরু হলে শিক্ষার্থীদের মনোনীত প্রার্থীরা সরকার গঠনের জন্য ৯০ দিন সময় পাবেন।

তবে নতুন সরকারের জন্য সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ চলতি বছরের শেষ হওয়ার আগেই জাতীয় বাজেট পাস করতে হবে। এরইমধ্যে সার্বিয়ায় সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের ঋণের পরিমাণ বাড়ছে।

দুর্নীতি নির্মূলের উদ্যোগ নিতে হলে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ব্যাপক পুনর্গঠন এবং বিচারব্যবস্থার সংস্কারও প্রয়োজন হবে।

বেলগ্রেডভিত্তিক আইনজীবী ও সাবেক সহ-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বোজো প্রেলেভিচ মনে করেন, ভুচিচের ১৪ বছরের শাসনের পর সার্বিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্নীতি ও ক্ষতিকর রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত করা প্রয়োজন। তার ভাষায়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ‘বিষমুক্তকরণ’ দরকার।

প্রেলেভিচ সতর্ক করে বলেন, ক্ষমতা হারালেও ভুচিচের সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা রাখবে। ফলে নিজেদের নীতি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে নতুন সরকারকে কঠিন রাজনৈতিক লড়াই চালাতে হবে।

আলেকসান্দার ভুচিচ। ছবি: এপি/ইউএনবি

 

অবশ্য ভুচিচ এবং তার দল সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি বারবার দমন-পীড়ন ও দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি সার্বিয়ার নতুন নেতৃত্বকে জটিল আন্তর্জাতিক সম্পর্কও সামাল দিতে হবে।

সার্বিয়ার ঐতিহ্যগত মিত্র এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান সরবরাহকারী দেশ রাশিয়া। নির্বাচনে ভুচিচের পরাজয়ের পর ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ তার প্রশংসা করেছেন। তবে শিক্ষার্থীদের বিজয়ে অভিনন্দন জানানো থেকে বিরত থেকেছেন তিনি।

শিক্ষার্থীদের প্রার্থী তালিকার প্রতিনিধি, সমাজবিজ্ঞানী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ইয়োভো বাকিচ রাশিয়ার আরটি বলকান টেলিভিশনকে বলেন, ‘আমরা রাশিয়াকে একটি বৃহৎ শক্তি হিসেবে সম্মান করি। একই সঙ্গে রাশিয়া আমাদের ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার এবং অনেক ক্ষেত্রে রক্ষাকর্তা।’

তিনি জানান, রাশিয়ার প্রতি সার্বিয়ার পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো পরিবর্তন আসবে না। এর মধ্যে মস্কোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করার অবস্থানও বহাল থাকবে।

নির্বাচনে জয়ের পর শিক্ষার্থীদের উল্লাস। ছবি: এপি/ইউএনবি

 

সার্বিয়ার রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিকে গভীর নজর রাখছে ইউক্রেনও। চার বছর ধরে চলা রুশ আগ্রাসন প্রতিহত করতে গিয়ে ইউক্রেন পরোক্ষভাবে সার্বিয়ার অস্ত্র থেকে সুবিধা পেয়েছে।

এদিকে ইউরোপীয় কর্মকর্তারা নির্বাচনে বিজয়ের জন্য শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সার্বিয়ার লড়াইয়ে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত থাকার কথাও জানিয়েছেন তারা।

শিক্ষার্থীবান্ধব রাজনৈতিক আন্দোলন মুভ-চেঞ্জের নেতা সাভো মানোইলোভিচ নতুন নেতৃত্বের সক্ষমতা নিয়ে আশা করেছেন।

তিনি বলেন, ‘আমি নিশ্চিত, শিক্ষার্থীদের প্রার্থী তালিকার প্রতিনিধিরা এত দিন যেভাবে পথ খুঁজে নিয়েছেন, সেভাবেই তারা দেশ পরিচালনায় সক্ষম একজনকে বেছে নেওয়ার উপায় খুঁজে পাবেন। সেই ব্যক্তির সামনে সার্বিয়াকে সংস্কারের মধ্য দিয়ে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকবে। এটি যেমন একটি বিশেষ সম্মানের বিষয়, তেমনি অত্যন্ত বড় দায়িত্বও।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad