যুক্তরাষ্ট্র কি পারমাণবিক বোমা বহনে সক্ষম পঞ্চম প্রজন্মের ‘বি-২ স্পিরিট’ ফাইটার বিমান ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে? এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে বিশ্ব সামরিক বিশ্লেষকদের মনে। উত্তর খোঁজা চেষ্টা করেছেন, দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিষয়ক সম্পাদক ড্যান সাব্বাগ।
তিনি তার বিশ্লেষণে বলছেন, এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়ে চলেছে। তবে তারা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাবে কিনা তা এখনও পরিস্কার নায়। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত গোপনীয়তার আশ্রয় নিচ্ছে।
কিছু বিষয় পর্যবেক্ষণ করে সাব্বাগ বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ যুদ্ধ বিমান ব্যবহারের কিছু ইঙ্গিত সাম্প্রতিক দিনগুলোতে পাওয়া গেছে। আর তা পাওয়া গেছে রিফুয়েলিং বিমানের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে। রোববার ৩১টিরও বেশি কেসি-১৩৫ ও কেসি-৪৬ রিফুয়েলিং বিমান ইউরোপ থেকে থেকে পূর্ব দিকে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। মঙ্গলবারও কিছু বিমান রওনা হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বিমান ট্র্যাকিং ও এভিয়েশন তথ্যাদি সংক্রান্ত পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা এয়ারন্যাভ সিস্টেমস পর্যবেক্ষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
বি-২ যুদ্ধ বিমানের সব থেকে বড় সুবিধা হচ্ছে এটি ৬ হাজার মাইল পথ কোন প্রকার রিফুয়েলিং ছাড়াই উড়তে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সব বিমান ঘাটি থেকে বি-২ যুদ্ধ বিমান উড়ানোর সুযোগ নেই। মাত্র তিনটি বিমান ঘাটি থেকে বি-২ অপােরেশন পরিচালনা করে থাকে। সেগুলো হচ্ছে: যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি, যুক্তরাজ্যের ফেয়ারফোর্ড ও ভারত মহাসাগরের ডিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপ থাকা বিমান ঘাটি থেকে। ডিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপটি যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে ইজারা নিয়ে ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র।
এপ্রিল মাসের স্যাটেলাইট ছবিতে ডিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে ৬টি বি-২ মোতায়েনের অস্তিত্ব মেলে। এরপর থেকে এ বিমান ঘাটির সক্ষমতা ক্রমেই বাড়িয়ে চলছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মোট ১৯টি সচল বি-২ রয়েছে।
সবশেষ গত অক্টোবর, হুইটম্যান ঘাঁটি থেকে উড়ে আসা বি-২ বিমান ইয়েমেনের হুথি বাহিনীর পাঁচটি ভূগর্ভস্থ ঘাঁটিতে হামলা করেছিল। সেই অভিযানটি ছিলো প্রায় ৮,০০০ মাইল দূরত্ব অতিক্রম করে। সেখানে দিয়েগো গার্সিয়া থেকে গোপন ও শক্তিশালী পারমাণবিক স্থাপনা-ফোর্ডো ফুয়েল এনরিচমেন্ট প্ল্যান্ট মাত্র ৩,২০০ মাইল, যা অনেক কাছের রেঞ্জে।
যুক্তরাষ্ট্র চাইছে যেকোন মূল্যে ফোর্ডো পারমানবিক স্থাপনাটি ধ্বংস করতে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো স্থাপনাটি পাহাড়ি অঞ্চলের নিচে গড়ে তোলা হয়েছে। যেখান থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়, সে হলগুলো মাটির ৮০ থেকে ৯০ মিটার নিচে। যা আধুনিক যুদ্ধবিমান বা বাঙ্কার-ধ্বংসী বোমা দিয়েও সহজে ধ্বংস করা কষ্টসাধ্য। এটি ধ্বংস করতে হলে জিবিইউ-ফিফটি সেভেন/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর বা নূন্যতম ৩০ হাজার পাউন্ড ওজনের গাইডেড বাঙ্কার-বাস্টার বোমার প্রয়োজন। যা একমাত্র পরিবহনে সক্ষম বি-২ যুদ্ধ বিমান।
এসব সমীকরণ সামনে রেখে ড্যান সাব্বাগ তার বিশ্লেষণে বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের টার্গেট ‘ফোর্ডো’ এবং তা সফল করতে হলে প্রয়োজন বি-২ ‘বি-২ স্পিরিট’ যুদ্ধ বিমান।
ইসরায়েল ইরানে হামলার প্রথম দিনেরই ফোর্ডো পারমানবিক স্থাপনায় হামলা করে। কিন্তু আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি সংস্থা বলছে, ওই হামলায় ফোর্ডোর তেমন ক্ষতি হয়নি।
এরই মধ্যে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও কুয়েত—উপসাগরীয় চার দেশ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তারা ইরানে হামলার জন্য মার্কিন যুদ্ধবিমানকে তাদের আকাশসীমা বা ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেবে না।
এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যের ঘাঁটিগুলো থেকে অনেকটাই দূরে ভারত মহাসাগরে বি-২ বিমানগুলো মোতায়েন করছে যুক্তরাষ্ট্র। ডিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটি ভারতের দক্ষিণে অবস্থিত এবং সেখান থেকে ইরান ও ইয়েমেনে এই বিমানগুলো দিয়ে অনায়াসে হামলা চালানো সম্ভব।
ড্যান সাব্বাগ বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ফোর্ডোতে হামলা করেই বসে তা হবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘ বৃহৎ আঞ্চলিক সংঘর্ষের দিকে ধাবিত হবে। যা এখন পর্যন্ত সম্ভাবনা, বাস্তবতা নয়।


