যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি: বিএনপি-জামায়াতের রহস্যময় মৌনতা

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি: বিএনপি-জামায়াতের রহস্যময় মৌনতা
Advertisement
Advertisement

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘জাতীয় স্বার্থ’ শব্দটি প্রায়শই দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার হয়। রাজপথের উত্তপ্ত স্লোগান থেকে শুরু করে টেলিভিশনের টকশো—সবখানেই দেশপ্রেমের খই ফোটে। কিন্তু যখন প্রকৃত অর্থেই জাতীয় স্বার্থ রক্ষার পরীক্ষা আসে, তখন অনেক বড় রাজনৈতিক দলের মুখোশ খুলে যায়।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের যে বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে তা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মধ্যে ক্ষোভ ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু যে রাজনৈতিক দলগুলো সামান্য ইস্যুতেও রাজপথ কাঁপিয়ে তোলে, সেই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এই চুক্তির বিষয়ে ‘রহস্যময়ভাবে নীরব’।

বিএনপি-জামায়াতের এই নীরব থাকার রহস্য ফাঁস করে দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, যিনি ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারেরও উপদেষ্টা। তিনি জানিয়েছেন, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীকে জানিয়েই এই চুক্তি করা হয়েছে। চুক্তিটি করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তবে বলা হয়, খলিলুর রহমানের উদ্যোগেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।

গোপনীয়তার মোড়কে এক অসম চুক্তি

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে, গত ৯ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকার তড়িঘড়ি করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই বাণিজ্য চুক্তিটি স্বাক্ষর করে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই চুক্তির শর্তাবলি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের পরিপন্থী। মোটাদাগে এই চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশের আমদানি বাণিজ্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাঁধা পড়ে যাবে। বাংলাদেশ চাইলেই যে কোনো দেশ থেকে যেকোনো পণ্য আমদানি করতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি-রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশকেও কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।

অর্থনীতিবিদরা তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করেছেন, এই চুক্তির প্রতিটি ছত্রে বাংলাদেশের স্বার্থকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে। মেধাস্বত্ব আইন, শুল্ক কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের দোহাই দিয়ে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যকে এক নিখুঁত ফাঁদে ফেলা হয়েছে।

একটি গণতান্ত্রিক দেশে জনগুরুত্বপূর্ণ যেকোনো চুক্তির আগে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা, সংসদে বিতর্ক এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। অভিযোগ উঠেছে, অন্তর্বর্তী সরকার গোপনে এই চুক্তি  সম্পাদন করেছে। কিন্তু সেটি যে একেবারে গোপনে হয়নি, সে কথাই ফাঁস করে দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

দ্বিচারিতার রাজনীতি

একটু পেছনে ফিরে তাকালে রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বিমুখী আচরণের একটি স্পষ্ট চিত্র ফুটে ওঠে। গত বছরের শুরুতে যখন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মানবিক সংকটে সহায়তা দেওয়ার জন্য একটি ‘মানবিক করিডোর’ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তখন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দল এর বিরোধিতা করেছিল। তাদের যুক্তি ছিল, এই করিডোর দিলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখেও সেদিন রাজনৈতিক দলগুলোর অনড় অবস্থানের কারণে অন্তর্বর্তী সরকার সেই সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিল।

আরও পড়ুন

অথচ যখন একটি অসম বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়েছে, তখন বিএনপি-জামায়াত নিশ্চুপ। অর্থনীতিবিদরা সমালোচনা করলেও এই দলগুলোর কেন এই মৌনতা?

খলিলুরের স্বীকারোক্তি ও থলের বিড়াল

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করার বিষয়ে খলিলুর রহমানের বক্তব্যের বিরোধিতা করেনি বিএনপি কিংবা জামায়াতে ইসলামী।

 

এনিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খানকে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।

আর জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ তাহের বলেছেন, অন্তবর্তী সরকারের করা বাণিজ্য চুক্তিতে বেশ কয়েকটি ইতিবাচক পয়েন্ট রয়েছে। জামায়াতে ইসলামী চুক্তির ইতিবাচক ধারাগুলোর প্রতিবাদ করবে না। অবশ্য দেশের দেশের স্বার্থে ব্যাঘাত ঘটে চুক্তির মধ্যে এমন কিছু থাকলে জামায়াত বা বিরোধী দল তা মানবে না বলেও জানান আব্দুল্লাহ তাহের।

তবে জামায়াতকে জানিয়েই এই চুক্তি হয়েছে কিনা এনিয়ে তিনি কোনো কথা বলেননি।

সরকারি ও বিরোধী দলের কথাতেই স্পষ্ট যে, খলিলুর রহমান যা বলেছেন ঠিকই বলেছেন।

খলিলুর রহমানের তথ্যফাঁস বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক নগ্ন সত্যকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন লাভের আশায় এবং ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সুগম করতেই বিএনপি ও জামায়াত এই চুক্তিতে সায় দিয়েছে।

ক্ষমতার মোহে আদর্শ বিসর্জন

বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি বরাবরই নিজেদের ‘জাতীয়তাবাদী’ ও ‘ইসলামী মূল্যবোধের’ রক্ষক হিসেবে দাবি করে। কিন্তু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রধান শর্তই হলো বহিঃশক্তির অন্যায্য চাপের কাছে মাথানত না করা। মানবিক করিডোরের সময় যে তেজ তারা দেখিয়েছিল, বাণিজ্য চুক্তির সময় তা কোথায় হারিয়ে গেল? এর উত্তর খুব সহজ—তদবির আর তোষামোদের রাজনীতি। বিএনপি-জামায়াত জানে, ক্ষমতায় যেতে হলে ওয়াশিংটনের আশীর্বাদ অপরিহার্য।

ওয়াশিংটনের সুনজরে থাকার আকুল আকাঙ্ক্ষায় এই দল দু’টি দেশের সাধারণ কৃষক, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থের কথা ভুলে গেছে। তাই তারা অসম বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে টু শব্দটিও করেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি রাখতে পারলে ক্ষমতায় যাওয়ার পথ মসৃণ হবে—এই সমীকরণ থেকেই তারা জাতীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়েছে। তাদের রাজনৈতিক লেনদেনে পণ্য হিসেবে ব্যবহার হয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad