ইতিহাসের গৌরব আর বর্তমানের ভয়াবহতা–এই দুই বিপরীত বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে হেমায়েতপুর-সিংগাইর-মানিকগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক। ঐতিহাসিকভাবে এটি মুঘল সম্রাট শেরশাহ শুরির নির্মিত উপমহাদেশখ্যাত গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একসময়ের বাণিজ্য ও প্রশাসনের প্রধান পথটি আজ এলাকাবাসীর কাছে স্রেফ একটি মরণফাঁদ।
মাত্র ২৪ ফুট প্রশস্ত এই সড়কে নেই কোনো ডিভাইডার কিংবা ফুটপাত। অথচ প্রতিদিন এখানে বাস, ট্রাক, ড্রাম ট্রাক এবং ইটভাটার গাড়ির পাশাপাশি হ্যালো বাইক ও অটোবাইকের মতো ধীরগতির যানবাহনও পাল্লা দিয়ে চলছে। অপরিকল্পিত উন্নয়ন আর অব্যবস্থাপনার কারণে সড়কটি এখন আতঙ্কের জনপদ।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কয়েক বছর আগে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কটির আংশিক উন্নয়ন করা হলেও তা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাটুরিয়াঘাটগামী ভারী যানবাহনগুলো দূরত্ব কমাতে এই পথ ব্যবহার করায় যান চলাচলের চাপ এখন কয়েকগুণ বেশি।
এই সড়কে প্রাণহানির চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ। স্থানীয় সূত্র ও গণমাধ্যমের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে। ২০২৪ সালের ৮ জানুয়ারি ঋষি পাড়া এলাকায় ড্রাম ট্রাক ও সিএনজির সংঘর্ষে একই পরিবারের দুই প্রজন্ম–জসিম তালুকদার ও তার ৫ বছরের নাতি ইয়াসিনসহ তিনজন নিহত হন। একই বছরের ২১ আগস্ট ধল্লা এলাকায় বাস ও ট্রাকের সংঘর্ষে প্রাণ হারান আরও তিনজন।
২০২৩ সালের অক্টোবরেও জয়মন্টপ এলাকায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান শাহিদুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি।
স্থানীয়দের জীবন এখন এই সড়কের ওপর চরমভাবে বিপন্ন। গণমাধ্যমকর্মী সাইফুল ইসলাম তানভীর আক্ষেপ করে বলেন, প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেই দুর্ঘটনার খবর সংগ্রহ করতে ছুটতে হচ্ছে।
জয়মন্টপ এলাকার ফার্মেসি মালিক সেলিম হোসেনের মতে, সড়কটি চার লেনে উন্নীত করা এবং ফুটপাত নির্মাণ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। এমনকি দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজ চালানোও এখানে ঝুঁকিপূর্ণ। সড়কের পাশে নিরাপদ স্লোপ বা সিঁড়ি না থাকায় খাদে পড়া যানবাহন থেকে আহতদের বাঁচাতে গিয়ে উদ্ধারকারীরাও জীবনের ঝুঁকিতে পড়ছেন।
সড়কের দক্ষিণ পাশে জেলা পরিষদের মালিকানাধীন জায়গা লিজ দেওয়া নিয়ে উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, ‘রাইট অব ওয়ে’ নীতিমালা উপেক্ষা করে অর্থের বিনিময়ে লিজ দেওয়া জায়গায় ব্যাঙের ছাতার মতো দোকানপাট গড়ে ওঠায় সড়কের দৃষ্টিসীমা সংকুচিত হয়ে গেছে।
এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. আব্দুল কাদের জিলানী জানান, জেলা পরিষদ তাদের কথা শুনছে না। বিষয়টি লিখিতভাবে ও সমন্বয় সভায় জানানো হয়েছে; লিজ বন্ধ হলে সড়কের জন্য ভালো হতো।
অন্যদিকে মানিকগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান জানান, জেলা পরিষদ একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাজস্ব আদায় করতে পারে, তবে কোনো স্টাফের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সড়কটিতে অবাধে চলছে অবৈধ হ্যালো বাইক ও অতিরিক্ত মালবোঝাই ট্রাক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ট্রাফিক পুলিশ সদস্য জানান, সড়কটি অত্যন্ত সংকীর্ণ হওয়ায় ভারী যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের এক কর্মকর্তা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, যানবাহনের চাপের কারণে সড়কটি চার লেনে উন্নীত করা ছাড়া স্থায়ী কোনো সমাধান নেই। মানিকগঞ্জ-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মমতাজ বেগম সড়কটি চার লেনে উন্নীত করার প্রস্তাব একনেকে পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু তা আজও আলোর মুখ দেখেনি।
এককালের সভ্যতা ও যোগাযোগের প্রতীক এই সড়ক নিয়ে এখন মানুষের মুখে মুখে ফিরছে ছড়াকার মিয়াজানের সেই আলোচিত পংক্তি–‘কেউ যদি যেতে চাও নরকে, চালাও গাড়ি সিংগাইর সড়কে।’
দ্রুততম সময়ে সড়কটিকে চার লেনে উন্নীত করা, ডিভাইডার ও ফুটপাত নির্মাণ এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা না হলে এই ঐতিহাসিক পথে লাশের মিছিল আরও দীর্ঘ হবে বলেই স্থানীয়দের আশঙ্কা।


