কক্সবাজারের ২ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের একটি সরু গলিতে প্লাস্টিকের তাবু ঘেরা ঘরে বসে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা বলছিলেন যুবনেতা মুজিবুর রহমান। তিনি জানান, ক্যাম্পের ভেতরে জীবনযাত্রার মান ক্রমাগত খারাপ হওয়ায় প্রতিদিন ঘর ছাড়ছে গড়ে ১০০ থেকে ১৫০ জন রোহিঙ্গা। উন্নত জীবনের আশায় শেষ পর্যন্ত মানবপাচারকারী চক্রের হাতে পড়ছে তারা।
মুজিবুর রহমানের মতে, আগে রোহিঙ্গারা মাথাপিছু মাসে ১২ ডলার সাহায্য পেত। এখন সেটি মাত্র ৭ ডলারে নেমে এসেছে। এই সামান্য টাকায় এক মাসের ভরণপোষণ তো দূরের কথা, একদিনের খাবার জোগানোই কঠিন। ফলে জীবন যাওয়ার ঝুঁকি আছে জেনেও রোহিঙ্গারা উপচে পড়া ভিড়ের ছোট নৌকায় চড়ে সাগর পাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। সাগরপথে তাদের গন্তব্য মালয়েশিয়া।
মুজিবুর রহমান বলেন, ক্যাম্পের ভেতরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও অবকাঠামো বর্তমানে বেশ দুর্বল। ক্যাম্পের চারপাশের কাঁটাতারের বেড়া এখন কেবল নামমাত্র টিকে আছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে, ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে যাতায়াতের ছোট ব্রিজগুলো। এরই মধ্যে ভারতের আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছে একটি ট্রলার ডুবে ২৫০ জন রোহিঙ্গা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় প্রকাশ পেয়েছে পাচার পরিস্থিতির ভয়াবহতা।
এনজিওকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত এক বছরে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। খাবারের রেশন কমে যাওয়া এবং এনজিওগুলোর কার্যক্রম সংকুচিত হওয়ায় রোহিঙ্গারা কাজ ও শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই সুযোগে মানবপাচারকারীরা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিদেশে ভালো কাজের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের ফাঁদে ফেলছে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা’র (আইওএম) তথ্যমতে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার রোহিঙ্গা অবৈধভাবে সাগরপথে যাত্রার চেষ্টা করেছে। এই যাত্রায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৮৯০ জন। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরে মৃত্যু ও নিখোঁজের হার বেড়েছে ৪০ শতাংশের বেশি।
জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত আরও ২ হাজার ৮০০ রোহিঙ্গা এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা বাড়িয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, কক্সবাজারে ২০১১ সাল থেকেই পাচারকারী চক্র সক্রিয়। বর্তমানে সোনাইছড়ি থেকে রেজু খাল এবং মনখালি থেকে নাফ নদী হয়ে টেকনাফের রুটগুলো বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। পাচারের আগে ভুক্তভোগীদের কক্সবাজার ও টেকনাফের পাহাড়ের গোপন আস্তানায় আটকে রাখা হয়।
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম জানান, ক্যাম্পের বেড়া দুর্বল হওয়ায় রোহিঙ্গারা অনায়াসেই যাতায়াত করতে পারছে। ইতিমধ্যে ১০ জন স্থানীয় সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
তদন্তে উঠে এসেছে, পাচারকারীদের একটি বড় নেটওয়ার্ক শাহপরীর দ্বীপ, সাবরাং ও বাহারছড়া এলাকায় কাজ করছে। পুলিশ জানায়, এই চক্রটি মূলত দুবাই এবং মালয়েশিয়া থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়। গত এপ্রিলে গ্রেপ্তার হওয়া তিন পাচারকারী হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে ক্যাম্পের ভেতর থেকে রোহিঙ্গাদের সংগ্রহ করত। সামুদ্রিক এই পথটি অত্যন্ত বিপজ্জনক হলেও পাচারকারীরা মেরিন ড্রাইভ সড়কের কম নজরদারি হওয়া অংশগুলো ব্যবহার করছে বলে জানান শাহপরীর দ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আব্দুল মান্নান।
ক্যাম্প-১৪ এর বাসিন্দা রবি আলমের মতে, নারীরা মূলত বিয়ের মাধ্যমে নিরাপদ জীবন ও স্থায়ী সংসারের আশায় এই ঝুঁকি নেয়। যদিও ২০২৪ সালে মালয়েশিয়া যাওয়া অনেক নারী পথে সহিংসতা ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, কিন্তু ভবিষ্যতের কথা ভেবে তারা মুখ খোলেন না।
রবি আলম আক্ষেপ করে বলেন, ক্যাম্পের ভেতরে কোনো উন্নতির সুযোগ না থাকায় পাচারকারীরা তরুণদের ইউএন কার্ডের ভুয়া প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁসিয়ে দিচ্ছে।
ইব্রাহিম নামে আরেক রোহিঙ্গা জানান, বিদেশি সহায়তা কমে যাওয়ায় ক্যাম্পে জীবিকা ও নিরাপত্তার চরম সংকট তৈরি হয়েছে। ইউএনএইচসিআর মুখপাত্র বাবর বালোচ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ২০২৬ সাল যেন আরেকটি প্রাণঘাতী বছর না হয়, সেজন্য বিশ্ববাসীকে এখনই সম্মিলিতভাবে সমাধানে আসতে হবে।
বর্তমানে রোহিঙ্গা সংকটে অর্থায়নের প্রধান উৎস বাংলাদেশ সরকারসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও ব্যাংক। তবে চাহিদার তুলনায় প্রাপ্তি অনেক কম। ২০২৪ সালে চাহিদার ৬৪ শতাংশ অর্থ পাওয়া গেলেও ২০২৫ সালে তা নেমে আসে ৪৬ শতাংশে। ট্রাম্প প্রশাসন রোহিঙ্গা সংকটের সাহায্য ৩০০ মিলিয়ন ডলার থেকে কমিয়ে মাত্র ১২ মিলিয়নে নামিয়ে এনেছে, যা শতকরা হিসেবে ৯৬ শতাংশ কম।
অর্থ সংকটের প্রভাবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবা ব্যাহত হচ্ছে। ইপসার প্রকল্প ব্যবস্থাপক যিশু বড়ুয়া জানান, এনজিওতে কাজের সুযোগ অর্ধেক হয়ে যাওয়ায় বেকারত্ব ও আর্থিক চাপ বাড়ছে। কোস্ট ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম জানান, ২০২৫ সালের জুনে তহবিলের অভাবে হাজার হাজার শিক্ষাকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে।
তবে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মনে করেন, কেবল অর্থ সংকট নয় বরং রাষ্ট্রহীনতা ও দীর্ঘদিনের হতাশাই রোহিঙ্গাদের পাচারের পথে ঠেলে দিচ্ছে।
ইউএনএইচসিআর এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কক্সবাজারে রোহিঙ্গা সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৮৪ হাজার ৮৬৪ জনে। প্রতি বছর ক্যাম্পে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার শিশু জন্ম নিচ্ছে। বর্ধিত জনসংখ্যা এবং সীমিত সুযোগের এই বৈপরীত্য ক্যাম্পের সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।


