গত এক দশক ধরে এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প। ট্যানারীর বর্জ্যে আটকে গেছে চামড়া রপ্তানি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের নায্যমূল্য ও বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা হারাচ্ছে দেশ।
রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে সাভারে একটি অসম্পূর্ণ শিল্পনগরীতে ট্যানারিগুলো সরিয়ে নেওয়ায় তৈরি হয়েছে এই বিপত্তি। সাভারের শিল্পনগরীতে কার্যকর বর্জ্য শোধন ব্যবস্থা না থাকায় মানহীন হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের চামড়া। এতে পশ্চিমা বিশ্বের উচ্চমূল্যের বাজার থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প। এখন অনেকটা অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে বিলিয়ন ডলারের এই শিল্প।
সাভারের ট্যানারি এস্টেটে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধন প্ল্যান্ট (সিইটিপি) এবং কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালু করার আগেই হাজারীবাগ থেকে ট্যানারিগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। প্রায় নয় বছর পার হয়ে গেলেও এখানকার বর্জ্য শোধন ব্যবস্থা এখনও লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) সনদের মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি।
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২৫ থেকে ২৬ কোটি বর্গফুট চামড়া উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে স্থানীয় চাহিদা মেটাতে ব্যবহৃত হয় মাত্র ৩০ শতাংশের কম। বাকি ৭০ শতাংশ চামড়া রপ্তানি করা হলেও তার দাম পাওয়া যাচ্ছে অত্যন্ত কম। আন্তর্জাতিক মানের সনদ না থাকায় এই চামড়া মূলত চীনের বাজারে পানির দরে বিক্রি করতে হচ্ছে।
সালমা ট্যানারি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাখাওয়াত উল্লাহ জানান, বর্তমানে চীনের বাজারে প্রতি বর্গফুট চামড়া মাত্র ৪৫ থেকে ৭৫ সেন্টে বিক্রি করতে হচ্ছে। অথচ এলডব্লিউজি সনদ থাকলে এই চামড়াই দেড় ডলার থেকে দুই ডলারে বিক্রি করা সম্ভব হতো। অর্থাৎ প্রতি বর্গফুটে বাংলাদেশ প্রায় ৭৫ সেন্ট থেকে সোয়া এক ডলার কম পাচ্ছে। রপ্তানির এই ঘাটতি বার্ষিক হিসেবে দাঁড়ায় কয়েকশ মিলিয়ন ডলার।
সাখাওয়াত উল্লাহর মতে, শুধুমাত্র কমপ্লায়েন্স বা বৈশ্বিক মানদণ্ড পূরণ করতে না পারার কারণে বাংলাদেশ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি হারাচ্ছে। এর ফলে একটি অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দেশে প্রচুর চামড়া উদ্বৃত্ত থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর চাহিদা মেটাতে প্রতি বছর প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার খরচ করে বিদেশ থেকে সনদপ্রাপ্ত চামড়া আমদানি করতে হচ্ছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে কাঁচা চামড়া রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৪০০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে মাত্র ১২৮ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। সামগ্রিকভাবে চামড়া, চামড়াজাত পণ্য ও জুতো রপ্তানির প্রবৃদ্ধি থমকে গেছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে যেখানে মোট রপ্তানি ছিল এক দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার, দশ বছর পর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা সামান্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক দশমিক ১৪৫ বিলিয়ন ডলারে।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, এই সংকটের মূল কারণ হলো আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হওয়া। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বড় বাজারগুলো বাংলাদেশ থেকে চামড়া কেনা কমিয়ে দিয়েছে। কারণ প্রায় আট বছর আগে যখন বৈশ্বিক ক্রেতারা এলডব্লিউজি সনদ বাধ্যতামূলক করা শুরু করে, ঠিক তখনই দেশের ট্যানারিগুলো স্থানান্তরের বিশৃঙ্খলার মধ্যে ছিল।
সাভারের এই শিল্পনগরীর প্রকল্পটির যাত্রা শুরু হয় ২০০৩ সালে। ২০০৫ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ১২ বার এর সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। ফলে ১৭৫ কোটি টাকার প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৭৮ কোটি টাকা। এত বিপুল বিনিয়োগের পরও সিইটিপি এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হয়নি। ২০২১ সালে চীনা ঠিকাদার কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই চলে যায়।
সাখাওয়াত উল্লাহ জানান, একটি সিইটিপিকে কার্যকর বলার আগে তার প্রপার কমিশনিং বা যান্ত্রিক পরীক্ষা সম্পন্ন করা প্রয়োজন, যা সাভারে কখনোই হয়নি। এছাড়া কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজও এখন শূন্য পর্যায়ে রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর ও এলডব্লিউজি’র মানদণ্ড পূরণ না হওয়ায় সাভারের কোনো ট্যানারিই এখন পর্যন্ত সনদ পায়নি।
বর্তমানে সারা দেশে মাত্র তিনটি ট্যানারি পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়ায় এলডব্লিউজি সনদপ্রাপ্ত। লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এলএফএমইএবি)-এর তথ্যমতে, আরও আটটি প্রতিষ্ঠানের সনদ থাকলেও সেগুলো সাভারের বাইরে এবং সবকটি পূর্ণাঙ্গ ট্যানারি নয়।
প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ এই দৌড়ে অনেক পিছিয়ে আছে। ভারতে বর্তমানে ৩৩৪টি এলডব্লিউজি সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এছাড়া চীনে ২৬৩টি, পাকিস্তানে ৬২টি এবং ভিয়েতনামে ২৭টি প্রতিষ্ঠান এই সনদ পেয়েছে। মানদণ্ডে পিছিয়ে থাকায় বাংলাদেশের রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশই এখন চীনের দিকে ঝুঁকেছে। আর মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশই নিম্নমানের ক্রাস্ট বা সেমি-ফিনিশড চামড়া।
তবে এই সংকটের মধ্যেও জুতো রপ্তানিতে আশার আলো দেখা গেছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে জুতো রপ্তানি যেখানে ৩৭৮ দশমিক ৫৪ মিলিয়ন ডলার ছিল, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ৭৮ শতাংশ বেড়ে ৬৭২ দশমিক ০৭ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ৪৯৬ মিলিয়ন জোড়া জুতো তৈরি করলেও স্থানীয় চামড়া ব্যবহার করতে পারছে না। কারণ বিদেশি ক্রেতারা এলডব্লিউজি সনদ ছাড়া চামড়া গ্রহণ করে না।
বাংলাদেশে বর্তমানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি মিলিয়ে প্রায় ৩,৮০০ প্রতিষ্ঠান এই খাতের সঙ্গে যুক্ত। সাখাওয়াত উল্লাহর মতে, ৩০০ থেকে ৩৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে সিইটিপি সংস্কার করলেই ২০৩০ সালের মধ্যে ৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব। অন্যথায় দেশ কম দামে কাঁচা চামড়া রপ্তানি এবং বেশি দামে সনদপ্রাপ্ত চামড়া আমদানির এই চক্রেই আটকে থাকবে।
সরকার অবশেষে স্বীকার করেছে, বিসিকের পরিবর্তে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) অথবা বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) মাধ্যমে এই প্রকল্পটি তদারকি করা উচিত ছিল।
সাখাওয়াত উল্লাহর মতে, ট্যানারি মালিকরা এখন দ্রুত সমাধান চান। কারণ এই খাতে বিনিয়োগের তুলনায় প্রিমিয়াম আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আয়ের সম্ভাবনা বহুগুণ বেশি।


