আসন্ন সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসারদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে। বিভিন্ন দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অভিযোগ, মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে রিটার্নিং অফিসারগণ একটি বিশেষ দলের প্রতি পক্ষপাত দেখিয়েছেন।
ক্ষুব্দ প্রার্থীরা বলছেন, এর বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশন দ্রুত কোনো ব্যবস্থা না নিলে আসন্ন নির্বাচন ‘সাজানো’ হিসাবে পরিচিতি পাবে। নির্বাচন ও নির্বাচন কমিশনের ওপর মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলবে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী এবার মনোনয়নপত্র বাতিলের হার ২৮ শতাংশ, যা সকল বড় দলের অংশ নেওয়া ২০০৮ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনের চেয়ে অনেক বেশি। এবার তিনশ’ আসনে মনোনয়নপত্র জমা পড়ে মোট দুই হাজার ৫৬৮টি। এর মধ্যে রিটার্নিং অফিসারগণ ৭২৩ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন। অথচ ২০০৮ সালের নির্বাচনে প্রার্থীতা বাতিলের হার ছিল ২২.৬৪ শতাংশ ও ২০১৮ সালে ২৫.৬৪ শতাংশ।
জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, এবি পার্টিসহ বেশ কিছু দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী অভিযোগ করেছেন, রিটার্নিং কর্মকর্তারা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষকে সুবিধা দিচ্ছেন। তারা বলছেন, সামান্য ভুলের জন্য তাদের মনোনয়ন বাতিল করা হলেও পছন্দের প্রার্থীদের একই ভুল এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।
কয়েকজন প্রার্থী জানান, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের এ ধরনের আচরণ নির্বাচনকে একটি ‘সাজানো নাটকে’ পরিণত করার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
নির্বাচন বিশেজ্ঞরা বলছেন, উপেক্ষা করার মতো ছোটখাটো ভুলের কারণে বিশাল সংখ্যার মনোনয়নপত্র বাতিল করা চিন্তার বিষয়।
নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলিম ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো ভালোভাবে তদন্ত করা দরকার। অভিযোগ সত্যি হলে তাদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া উচিত, না হলে কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। অবশ্য তিনি বলেন, নির্বাচনের সামগ্রিক গুণগত মান বিচার করার সময় এখনও আসেনি।
তবে নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নওয়াজ ‘টাইমস’কে বলেন, প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র বাতিলের বিরুদ্ধে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত আপিল করতে পারবেন। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন আপিলের ক্ষেত্রে সাধারণত নমনীয় থাকে।
আপিলের প্রথম দিন সোমবার জামায়াত নেতা এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ এবং ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারাসহ ৪২ জন প্রার্থী তাদের মনোনয়ন বাতিলের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন।
মনোনয়নপত্র বাতিলে পক্ষপাতিত্বের উদাহরণ দিয়ে কয়েকজন প্রার্থী বলেন, দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে সিলেট-৩ আসনে বিএনপি প্রার্থী এম এ মালিকের মনোনয়নপত্র নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও পরে তা গ্রহণ করা হয়। অন্যদিকে একই কারণে সিলেট-১ আসনের এনসিপি প্রার্থী এহতেশামুল হকের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।
কুড়িগ্রাম-৩, নেত্রকোনা-৫, কক্সবাজার-২ এবং গাইবান্ধা-১ আসনেও একই ধরনের আচরণ করা হয়েছে বলে জানান জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা। তাদের অভিযোগ, তুচ্ছ বা রাজনৈতিক কারণে তাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।
কক্সবাজার-২ আসনে মনোনয়ন বাতিল হওয়া জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ সরাসরি পক্ষপাতের অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেন, “যখন আমার মনোনয়ন বাতিল করা হলো, তখন কর্মকর্তারা তালি দিচ্ছিলেন। কোনো সঠিক কারণ ছাড়াই একজন বিএনপি প্রার্থীকে দিয়ে আমার বিরুদ্ধে তথ্য গোপনের অভিযোগ করানো হয়েছিল। এটি সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষণ নয়।”
মানিকগঞ্জ-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আতাউর রহমান দাবি করেছেন যে, রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়েই তিনি এক বিএনপি প্রার্থীর সমর্থকদের হাতে মার খেয়েছেন, কিন্তু অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি। ঢাকা-১৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মহিউদ্দিন রনি বলেন, সব কাগজপত্র ঠিক থাকা সত্ত্বেও কর্মকর্তারা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পাত্তা দিচ্ছেন না এবং তার মনোনয়ন বাতিল করেছেন।
বাতিল হওয়া মনোনয়নগুলোর বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি, যেখানে ৩৩৮টি মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। রাজনৈতিক দলের মধ্যে জাতীয় পার্টির ৫৯ জন, ইসলামী আন্দোলনের ৩৯ জন, সিপিবির ২৫ জন এবং জামায়াতের ১০ জন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। সবচেয়ে কম বাতিল হয়েছে এনসিপির, মাত্র ৩ জন। এছাড়া বিএনপির ২৫ জন নেতা দলীয় মনোনয়নের কাগজ দিতে না পেরে এখন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।


