প্রথমবারের মতো ভিয়েতনামে পূর্ণ দূরত্বের আয়রনম্যান প্রতিযোগিতা সফলভাবে সম্পন্ন করলেন বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদ মো. সাজেদুর রহমান। এবারে তিনিই ছিলেন এ প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের একমাত্র অংশগ্রহণকারী।
গত রোববার ভিয়েতনামের দানাং শহরে অনুষ্ঠিত এই আন্তর্জাতিক আয়োজনে অংশ নিয়ে তিনি নির্ধারিত দূরত্ব অতিক্রম করেন ১৫ ঘণ্টা ৩৪ মিনিট সময়ে।
ট্রায়াথলন হলো সাঁতার, সাইক্লিং ও দৌড়—এই তিনটি ডিসিপ্লিনের সমন্বয়ে গঠিত একটি সহনশীলতার খেলা। আর একদিনে অনুষ্ঠিত পূর্ণ দূরত্বের আয়রনম্যানকে ধরা হয় বিশ্বের অন্যতম কঠিন ক্রীড়া চ্যালেঞ্জ হিসেবে। এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের ৩ দশমিক ৮ কিলোমিটার সাঁতার, ১৮০ কিলোমিটার সাইক্লিং এবং ৪২ দশমিক ২ কিলোমিটার ম্যারাথন দৌড় সম্পন্ন করতে হয়। সাজেদুর রহমান ৩৫ থেকে ৩৯ বছর বয়স বিভাগে অংশ নেন।
রেস শেষে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সাজেদুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিনিধি হওয়ায় নিজের ভেতরে আলাদা এক জেদ কাজ করছিল।’
তিনি জানান, শুরুতেই ১ ঘণ্টা ২২ মিনিটে ৩ দশমিক ৮ কিলোমিটার সাঁতার শেষ করে মাত্র পাঁচ মিনিট ট্রানজিশন নিয়ে সাইক্লিং শুরু করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত গতিতে এগোলেও রেস চলাকালে দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি। প্রায় ৮০ কিলোমিটার অতিক্রম করার পর এক গ্রাব ড্রাইভারের হঠাৎ রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টায় ব্রেক করতে গিয়ে পড়ে যান এবং ডান পায়ে আঘাত পান। এতে সাইকেলের চাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এরপরও থেমে যাননি তিনি। বিভিন্ন হাইড্রেশন পয়েন্টে মেকানিকের সহায়তা চাইলেও দ্রুত সহযোগিতা পাননি। শেষ পর্যন্ত নিজেই চাকা ঠিক করে আবার রেস চালিয়ে যান। তবে দুর্ঘটনার পর থেকে সাইকেলের গতি কমে যায় এবং শারীরিক অবস্থাও খারাপ হতে থাকে। পর্যাপ্ত খাবার গ্রহণ করতে না পারায় পুরো রেসজুড়েই তাকে শারীরিক দুর্বলতার সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে।
সাজেদুর রহমান জানান, রানিং সেগমেন্ট শুরু করার আগেই তিনি দুইবার বমি করেন। তখন মাথায় বারবার রেস ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা এলেও মেয়ের কথা এবং বাংলাদেশের পতাকার কথা মনে করে তিনি নতুন করে নিজেকে সাহস জোগান তিনি।
তিনি বলেন, ‘মনে হচ্ছিল, আমি থেমে গেলে যেন বাংলাদেশই হেরে যাবে। তাই সিদ্ধান্ত নিই, যেভাবেই হোক রেস শেষ করব। ফিনিশ লাইনে আমাকে পতাকা দেওয়ার মতো কেউ ছিল না, তাই বাংলাদেশের পতাকা ট্রাইস্যুটের পকেটে নিয়েই পুরো রান করেছি।’
রেসের শেষ কয়েক কিলোমিটারে আবার গতি বাড়িয়ে হাতে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে শক্তভাবে ফিনিশ লাইন অতিক্রম করেন তিনি।
সাজেদুর রহমান তার এই যাত্রায় পাশে থাকার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক, বিডিট্রাই কমিউনিটি, Este Aesthetic Hospital, Pubali Bank Limited এবং The Punch Company-সহ সব শুভাকাঙ্ক্ষীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
এর আগে, ২০২২ এ ফ্রাঙ্কফুর্টে তার প্রথম প্রচেষ্টা ছিল আয়রনম্যান ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ, যেখানে তিনি রেস সম্পন্ন করতে পারেননি। পরবর্তীতে চব্বিশ সালে হামবুর্গে এবং পরের বছর মালয়েশিয়ায় আয়রনম্যান ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ সফলভাবে সম্পন্ন করেন। আর এ বছর আয়রনম্যান ভিয়েতনাম শেষ করে নিজের তৃতীয় পূর্ণ দূরত্বের আয়রনম্যান সম্পন্ন করার কৃতিত্ব অর্জন করলেন তিনি।
আয়রনম্যানের বৈশ্বিক কর্তৃপক্ষ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিয়মিত আয়রনম্যান ও আয়রনম্যান ৭০.৩ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে। এসব আয়োজনের ফলাফলের ভিত্তিতে ট্রায়াথলেটরা পরবর্তীতে আয়রনম্যান ও আয়রনম্যান ৭০.৩ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করেন।
পেশাগত জীবনে মো. সাজেদুর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন যুগ্ম পরিচালক হিসেবে কর্মরত আছেন।


