দীর্ঘদিনের অস্বস্তিকর সম্পর্কের পর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ নতুন করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, এই সম্পর্ক স্বৈরাচারী সরকারের অধীনে ১৫ বছরের সম্পর্ক থেকে বের হয়ে নতুন দিকে যাবে। তাই ভারতে প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় সফর হওয়া উচিত।
রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার আগে বা সাইডলাইনে ভারতের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ভারতের সঙ্গে ভালো ও কার্যকর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ে তুলতে বাংলাদেশ একটি দ্বিপক্ষীয় সফরকে অগ্রাধিকার দিতে চায়। তবে এর অর্থ এই নয় যে কোনো বহুপক্ষীয় ফোরামে গিয়ে অন্য দেশের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করা হবে না।
তিনি বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে আমরা একটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক চাই। আমরা সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করতে চাই। এতদিন একটি ঝামেলাগ্রস্ত, ত্রুটিপূর্ণ, লুটেরা, স্বৈরাচার সরকারের সঙ্গে ১৫ বছরের সম্পর্ক ছিল। এই সম্পর্ক থেকে বের হয়ে এখন একটি নতুন সম্পর্কের দিকে যাব। এটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মাধ্যমেই করব।’
জাতিসংঘের মতো বহুপক্ষীয় ফোরামে ভারতের সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া হয়নি উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির বলেন, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক আমন্ত্রণ থাকলে সাইডলাইনে বৈঠক হতে পারে। বহুপক্ষীয় ফোরামে কোন দেশের সঙ্গে কখন বৈঠক হবে, সেটি পরিস্থিতি ও সুযোগের ওপর নির্ভর করবে।
ভারত নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন না করে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ডেইলি ঘুম থেকে উঠে ব্রেকফাস্ট খাইতেই ইন্ডিয়া, লাঞ্চ খাইতেই ইন্ডিয়া, ডিনার খাইতেই ইন্ডিয়া—তাহলে ভাই, আপনার নিজের দেশের খাবার কোন সময় খাবেন? খালি যদি ইন্ডিয়া ইন্ডিয়া করেন! নিজের দেশের চিন্তা করেন।’
সীমান্তে হত্যাকাণ্ড এবং বাংলাদেশিদের ধরে নিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাগুলো ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিকভাবে আলোচনা করা হবে জানিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, সীমান্ত ও সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক আইন ও সীমান্ত প্রটোকল রয়েছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কাঠামোগত চুক্তিও রয়েছে। এসব কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশের উদ্বেগের বিষয়গুলো বিভিন্ন পর্যায়ে তুলে ধরা হবে।
ভারতের সঙ্গে ১০১টি চুক্তির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং সংসদীয় কমিটিতে তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে চিফ হুইপের কাছে জানতে সাংবাদিকদের পরামর্শ দেন তিনি।
‘জাতিসংঘে বাংলাদেশের ভিশন তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী’
প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের নতুন সরকারের ভিশন তুলে ধরবেন উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির জানান, আগামী ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের উদ্দেশে রওনা হয়ে ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করার সম্ভাবনা রয়েছে তার। এ সময়ে জাতিসংঘে ভাষণ দেওয়ার পাশাপাশি বিশ্বনেতাদের সঙ্গেও বিভিন্ন বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী।
বিশ্বনেতাদের সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ভাবনা তুলে ধরার পাশাপাশি বিশ্বশান্তি, টেকসই সমাধান ও সংঘাত নিরসনে বাংলাদেশের ভূমিকার কথাও প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে থাকবে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে দারিদ্র্য দূরীকরণ, স্থানীয় অর্থনীতিতে মানুষের আকাঙ্ক্ষা তৈরি, বিভিন্ন নীতিগত উদ্যোগ এবং জলবায়ু নিরাপত্তা ও জলবায়ু অর্থায়নে বাংলাদেশের নেতৃত্বের বিষয়গুলোও ভাষণে স্থান পেতে পারে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সাইডলাইনে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে উচ্চপর্যায়ের একটি আলোচনা আয়োজনের কথাও জানান হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য ‘টপ প্রায়োরিটি’। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্বের সময়ও এ সংকটকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ বিষয়ে সচেতনতা ও দৃশ্যমানতা বাড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
‘পাচার হওয়া অর্থ জনগণকে ফেরত দিতে হবে’
দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ ফেরত আনার বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় অংশীদারের সঙ্গে এ বিষয়ে কাজ করছে। যুক্তরাজ্যের সঙ্গেও বাংলাদেশের এ বিষয়ে একটি অংশীদারত্ব রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ফরেনসিক দক্ষতা ও সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ‘কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমরা কাজ করব, যাতে বাংলাদেশের মানুষের কাছ থেকে চুরি করা সম্পদ ও অর্থ উদ্ধার করা যায়। যাতে জনগণ তাদের অর্থ ফিরে পায় এবং সেই অর্থ তাদের জন্য ব্যয় করা হয়।’
‘পুতুলের নিয়োগ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জন্য লজ্জার’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় (ডব্লিউএইচও) সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এটা কোনো বিস্ময়ের বিষয় ছিল না। বিশ্বাসযোগ্য কোনো যোগ্যতা ও দক্ষতা না থাকা সত্ত্বেও শুধু তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে—এই কারণে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে পুতুলকে ডব্লিউএইচও-এর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনাকে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জন্য ‘লজ্জার’ বিষয় বলেও বর্ণনা করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে আরও গুরুত্ব ও যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
হুমায়ুন কবির বলেন, এমন মানুষ দরকার, যারা সংস্থার নেতৃত্ব দিতে পারবেন। এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে খুবই সতর্ক ও দায়িত্বশীল হতে হবে।
কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিবার বা শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কারণে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কোনো ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।


