গত বছরের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা হারানোর পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পাড়ি জমান ভারতে। শুরুতে তাকে ‘কিছুদিনের জন্য’ আশ্রয় দিতে রাজি হয়েছিল দিল্লি, ১৫ মাস পরও এখনও সেখানেই আছেন হাসিনা। তখন প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছিল, তার পরবর্তী আশ্রয়স্থল হতে পারে লন্ডন বা অন্য কোনো দেশ। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি।
বিশেষজ্ঞরা এখন বলছেন, ওই সময়ে তার স্বল্পমেয়াদি অবস্থানের যে বার্তা প্রচার করা হয়েছিল, তা আসলে একটি আড়াল। দিল্লিতে সর্বদলীয় এক বৈঠকেও তার অবস্থান স্বীকৃতি পেয়েছিল। ভারতের কাছে শেখ হাসিনা দরকষাকষির এক মূল্যবান হাতিয়ার, যাকে ঘিরে বাংলাদেশে রাজনৈতিক নানা হিসাব-নিকাশ চালানো যায়।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মো. আবদুল হাই টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘শেখ হাসিনাই যে আওয়ামী লীগের প্রতীক এবং এখনও বাংলাদেশ রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক, তা ভারত খুব ভালোমতোই জানে।’
‘যদিও প্রথমদিকে তার দীর্ঘ অবস্থান দেশীয় রাজনীতিতে কী বার্তা দেবে, তা নিয়ে বেশ সতর্ক ছিল ভারত’, বলেন তিনি।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মো. সুফিউর রহমানও একই মত জানান। তিনি বলেন, ‘৫ আগস্টের পর ভারত সময় নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছে। ভারতের চেয়ে কম আরামদায়ক কোনো গন্তব্যে যে তিনি যাবেন তা বিশ্বাস করা কঠিন। ভারতে থেকে নিজের দলকে উৎসাহিত করা এবং দিকনির্দেশনা দেওয়া তার জন্য সহজ।’
তিনি আরও বলেন, দলকে একত্রিত রাখার এমন সম্ভাবনা ছাড়াও, শেখ হাসিনা যদি লন্ডন বা অন্য কোনো দেশে থাকতেন, তাহলে দিল্লির পক্ষে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রভাব খাটানো কঠিন হয়ে যেত।
৫ আগস্টের আগের রাজনৈতিক উত্তেজনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, হাসিনা এর আগেই দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তিনি সব সময়ই ভারতের দিকেই ঝুঁকেছিলেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সদস্যভুক্ত কোনো দেশে যাওয়ার পরিকল্পনা তার ছিল না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র জানায়, ৫ আগস্টের আগেই একজন জ্যেষ্ঠ ভারতীয় কর্মকর্তা ঢাকায় এসে তাকে সামগ্রিক পরিস্থিতির সম্পর্কে জানান। দিল্লি তার অবস্থানের বিষয়ে সব ব্যবস্থা করবে বলেও জানান। দিল্লিতে পৌঁছানোর পর থেকে হাসিনা সেখানে বিদেশি কূটনীতিকদের মতোই নিরাপত্তা ও প্রোটোকল পাচ্ছেন।
এ বিষয়ে জ্ঞাত এমন আরেকটি সূত্র বলছে, লন্ডনে আশ্রয় নেওয়ার গুঞ্জনটি ছিল কৌশলগত আড়াল। সূত্রটির ভাষায়, ‘আইসিসির সদস্য কোনো দেশে তিনি কখনোই আশ্রয় স্থায়ী হতে চাইতেন না। কারণ এ আদালতে কোনো মামলা হলে সেই দেশ তাকে হস্তান্তর করতে বাধ্য থাকত।’
এসব ব্যাখ্যা থেকেই বোঝা যায় যে, তার দেশত্যাগ ছিল সুপরিকল্পিত এবং ভারতই ছিল তার প্রধান এবং সম্ভবত একমাত্র নিরাপদ গন্তব্য।
ভারতের এক কৌশলগত সম্পদ
গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা হারালেও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেটওয়ার্ক এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এখনো যে শেখ হাসিনার প্রভাব আছে, তা ভারত জানে।
রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘এটা এক ধরনের নীরব চাপের কৌশল, যার নিজস্ব রাজনৈতিক গতিবিধি আছে।’
রাষ্ট্রদূত সুফিউর রহমান মনে করেন, ‘বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক আলোচনায় প্রভাব রাখার জন্য শেখ হাসিনা ভারতের কাছে দরকষাকষির এক হাতিয়ার।’
ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ হয়তো খুব দ্রুত ক্ষমতায় ফিরতে পারবে না, তবে বিরোধীদলগুলোর ঐক্যহীনতা ও লক্ষ্যহীনতার কারণে আওয়ামী লীগের ফিরে আসা হয়তো খুব দূরেও নয়। তার মতে, এটিই ভারতকে তাদের হারিয়ে ফেলা অবস্থান আবার ফিরে পাওয়ার আশা দেখাচ্ছে এবং হাসিনার কাছেও প্রভাব ধরে রাখার কারণ তুলে ধরছে।
দীর্ঘ সম্পর্কের রাজনৈতিক হিসাব
ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনার সম্পর্ক চার দশকেরও বেশি পুরোনো। ১৯৭৫ সালের পর তিনি ও শেখ রেহানা ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং ছয় বছর সেখানে ছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিবেশী কূটনীতিতে ভারতের বিভিন্ন ভুল এবং চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কারণে বর্তমানে হাসিনার কৌশলগত মূল্য দিল্লির কাছে আরও বেড়েছে।
রাষ্ট্রদূত আবদুল হাই বলেন, ‘হাসিনা সরকার পতনের পর বাংলাদেশের ক্ষমতার কাঠামো খুবই টালমাটাল ছিল। শিক্ষার্থী, সেনাবাহিনী, বিএনপি, জামায়াত—অনেক পক্ষই সক্রিয় ছিল।’
‘ভারত প্রথমে সতর্ক অবস্থানে ছিল, পরে পরিস্থিতি বুঝে নতুন ক্ষমতার সমীকরণে প্রভাব রাখার সুযোগ তৈরি করতে সক্ষম হয়,’ বলেন তিনি।
তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভারত যে রাজনৈতিক স্থান হারিয়েছিল তা তারা আবার ফিরে পেয়েছে বলেই উল্লেখ করেন তিনি।
রাষ্ট্রদূত সুফিউর রহমান জানান রাজনৈতিক মিত্রদের আশ্রয় দেওয়া ভারতের জন্য অস্বাভাবিক নয়; বরং একটি কূটনৈতিক বাধ্যবাধকতা। তিনি বলেন, ‘দালাই লামাকে দেখুন—দশকের পর দশক ধরে তিনি ভারতে আছেন,’। সরকার পতনের পর শত শত আওয়ামী লীগ নেতা ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। তার মতে, মূল্য যতই চুকাতে হোক না কেন, আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি যত্ন ভারত দেখাবেই।


