বিপন্ন তিস্তা: প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন চায় নদী পাড়ের মানুষ

বিপন্ন তিস্তা: প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন চায় নদী পাড়ের মানুষ
Advertisement
Advertisement

একসময়ের প্রমত্তা তিস্তা নদী এখন প্রায় পানিশূন্য। নদীর বুক চিরে জেগে উঠেছে শতাধিক বালুচর। এর ফলে ব্যাহত হচ্ছে চাষাবাদ, মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে এই অঞ্চলের জীববৈচিত্র।

শুষ্ক মৌসুমের এই হাহাকার বর্ষাকালে আরও ভয়ংকর রূপ নেয়, যখন সামান্য পানিতেই সৃষ্টি হয় ভয়াবহ বন্যা ও নদী ভাঙন। এর ফলে প্রতি বছর হাজার হাজার পরিবার নতুন করে ভূমিহীন হয়ে পড়ছে। তিস্তাপাড়ের এই দীর্ঘদিনের বঞ্চনা দূর করতে গত কয়েক দশকে প্রতিবারই ভোটের আগে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তবে সেসব আশ্বাস আজও কেবল আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে, পরিবর্তন হয়নি নদীপাড়ের মানুষের ভাগ্য।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত হয়েছে নতুন সরকার। নির্বাচনের আগে বিএনপি ও জামায়াতসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল তাদের নির্বাচনী জনসভায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করে ভোট প্রার্থনা করেছিল। তিস্তাপাড়ের মানুষ এখন সেই প্রতিশ্রুতির দ্রুত বাস্তবায়ন চান।

বর্তমানে তিস্তা নদীর বাংলাদেশ অংশের ১১৫ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে শোনা যায় শুধুই বঞ্চনার দীর্ঘশ্বাস। লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারী ও সদর উপজেলাসহ উত্তরবঙ্গের পাঁচটি জেলায় এখন সেচের পানির তীব্র হাহাকার চলছে। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় অবস্থিত ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা ব্যারাজ এলাকায় পানির স্তর এতটাই নিচে নেমে গেছে যে, সেচ প্রকল্পের ক্যানেলগুলো এখন মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, শুষ্ক মৌসুমে এই অঞ্চলে ন্যূনতম পাঁচ হাজার কিউসেক পানির প্রয়োজন। সেখানে বর্তমানে প্রবাহ নেমে এসেছে মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০ কিউসেকে। নদী শুকিয়ে যাওয়ার ফলে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনক হারে নিচে নেমে যাচ্ছে। সাধারণ অগভীর নলকূপ দিয়েও পানি উঠছে না। এতে বোরো চাষাবাদ চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে, যা পুরো উত্তরবঙ্গের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে।

ভারতের সিকিম থেকে উৎপত্তি হওয়া ৩১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ তিস্তা নদীর প্রায় ১১৫ কিলোমিটার বাংলাদেশে অবস্থিত। আন্তর্জাতিক পানি আইন এবং ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘ জলপ্রবাহ কনভেনশন অনুযায়ী, আন্তঃসীমান্ত নদীর পানির ওপর ভাটির দেশের ন্যায্য অধিকার আছে। কিন্তু ভারত আন্তর্জাতিক রীতিনীতির তোয়াক্কা না করে পশ্চিমবঙ্গের গজলডোবায় ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে প্রায় সবটুকু পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। এর করুণ পরিণতি ভোগ করছে বাংলাদেশ, যেখানে বর্ষায় ভারত অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিলে নদী ভরাট থাকায় ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়।

আরও পড়ুন

নদীপাড়ের মানুষের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে লালমনিরহাট সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ ইউনিয়নের ষাটোর্ধ্ব বাসিন্দা মহসিন আলী জানান, তিস্তার পাড়েই তার জন্ম। এ পর্যন্ত ১১ বার নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে তার বসতভিটা। বর্তমানে অন্যের জমিতে বর্গাচাষ করে সংসার চালানো এই বৃদ্ধ বলেন, বিগত সরকার তিস্তা মহাপরিকল্পনার কথা দিলেও কাজ করেনি। এবারের ভোটেও সবাই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তাই এখন তিনি কাজের বাস্তবায়ন দেখতে চান।

একই এলাকার সাফিয়া খাতুন জানান, তিনি কেবল ত্রাণের আশায় নয় বরং তিস্তার স্থায়ী সমাধানের আশায় ভোট দিয়েছেন।

চর হরিণচওড়ার বাসিন্দা ছাবেদ আলীর মতে, নদীতে পানি না থাকায় মানুষ এখন হেঁটে নদী পার হচ্ছে। নদীতে যতটুকু পানি আছে তা সেচের কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী চরের রবিউল হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, নদী ভাঙনে ১৪ একর জমি হারিয়ে এখন তিনি চরে ঘর বেঁধেছেন। নির্বাচনের সময় নেতারা পায়ে ধরে প্রতিশ্রুতি দিলেও নদী যখন ঘরবাড়ি কেড়ে নেয়, তখন কেউ পাশে থাকে না।

‘তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদে’র লালমনিরহাট সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম কানু বলেন, তিন সরকারের পালাবদল হলেও মানুষের দুঃখ ঘোচেনি। তাই প্রার্থীদের দেওয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি।

লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার রায় জানান, গত এক দশকে নদীর তলদেশে প্রায় ২ থেকে ৩ মিটার পলি জমেছে। এর ফলে বর্ষায় সামান্য পানিতেই নদী ৩ থেকে ৫ কিলোমিটার চওড়া হয়ে যায়। তবে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তিস্তা তার প্রাণ ফিরে পাবে এবং এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন আসবে।

এদিকে তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক বর্তমান সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু সম্প্রতি লালমনিরহাট সফরে এসে আশার বাণী শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, তিস্তাপাড়ের সন্তান হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন এই নদী নিয়ে আন্দোলন করেছেন এবং এই নদীর কান্না তাকে আবেগাপ্লুত করে।

তিনি জানান, উত্তরবঙ্গের দুই কোটি মানুষের এই আকাঙ্ক্ষা পূরণে সরকার কাজ শুরু করেছে। ইতিমধ্যে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দুই মন্ত্রীর সাথে এ বিষয়ে কথা হয়েছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad