ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দামে ধাক্কা লেগেছে। এতে হরমুজ প্রণালির বিকল্প বাণিজ্য ও জ্বালানি পথ তৈরিতে ইউরোপের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার ও ভবিষ্যৎ সংঘাতের প্রভাব কমাতে উপসাগরীয় দেশ ও ভারতের দিকে ঝুঁকছে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোর (আইএমইসি) প্রকল্পের প্রতি নতুন করে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। চলতি সপ্তাহের জি৭ শীর্ষ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আরও স্থিতিশীল ও পছন্দের বিকল্পসহ নতুন রপ্তানি পথ তৈরি করা হয়েছে। আইএমইসি এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।’
রাশিয়া আগ্রাসী মনোভাব কমাচ্ছে না, মার্কিন কৌশলগত বন্ধনও শিথিল হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আইএমইসি-কে ইইউ-এর কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন জোরদার, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সরবরাহ শৃঙ্খলের বৈচিত্র্যকরণ ও জ্বালানি নিরাপত্তার সম্ভাব্য উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইইউ সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে আইএমইসি-কে সমর্থন করলেও এর ২৭টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে মাত্র কয়েকটি আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরকারী। তবে পর্দার আড়ালে রাজনৈতিক অঙ্গীকার বেশ জোরালো। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইইউ-এর এক উচ্চপদস্থ কূটনীতিক জানান, এখন মূল লক্ষ্য পরিবহন ও বাণিজ্য, জ্বালানি এবং ডিজিটাল সংযোগ— এই তিনটি স্তরের রূপকল্পকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। অবকাঠামোর মধ্যে নতুন পাইপলাইন ও সঞ্চালন তারও থাকতে পারে। ইইউ-র সংবাদ দপ্তর প্রকল্পের সময়সীমা জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
আইএমইসি ইসরায়েলের মধ্য দিয়ে যাবে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে আলোচনা শেষে একে ‘বৈপ্লবিক ও রূপান্তরমূলক উন্নয়ন’ বলে অভিহিত করেছেন।
‘কোয়ালিশন ফর রিজিওনাল সিকিউরিটি’র সহ-প্রতিষ্ঠাতা লিয়ান পোলাক-ডেভিড বলেন, ‘ইসরায়েল ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক না হলে আইএমইসি বাস্তবায়িত হতে পারে না।’ মার্কিন নেতৃত্বই এই সম্পর্ক তৈরিতে মূল চাবিকাঠি। তবে সৌদি আরব জানিয়েছে, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট পথরেখার শর্তেই তারা সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে। নেতানিয়াহু এর বিরোধী। অন্যদিকে, ইরান যুদ্ধ সৌদি আরবের চিন্তাভাবনায় কী প্রভাব ফেলবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। সৌদি কর্মকর্তারা এই বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ভন ডার লেয়েন জানান, ইরান যুদ্ধের প্রথম ৫৪ দিনে ইইউ তেল ও গ্যাস আমদানিতে অতিরিক্ত ২৫ বিলিয়ন ইউরো (২৯ বিলিয়ন ডলার) ব্যয় করেছে। দীর্ঘমেয়াদে জেট ফুয়েল ঘাটতির ঝুঁকিও রয়েছে।
তিনি ও ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা এপ্রিলে জানান, হরমুজ প্রণালির মতো সংঘাতপূর্ণ এলাকা এড়াতে নতুন জ্বালানি অবকাঠামো স্থাপনে তারা উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে জোট বাঁধতে প্রস্তুত।
সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনে এই বিকল্পের গুরুত্ব স্পষ্ট। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর আরামকো দৈনিক তেল পরিবহন ক্ষমতা ৭০ লক্ষ ব্যারেলে বাড়িয়েছে। ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র পাস্কাল কনফাব্রো জানান, জি৭ নেতারা হরমুজ প্রণালির বাইরে স্থলভাগের অবকাঠামো অর্থায়নের উপায় খুঁজছেন।
ইইউ-এর এক কর্মকর্তা জানান, তারা উপসাগরীয় অঞ্চলের নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোকে উৎসাহিত করবেন। ‘জার্মান মার্শাল ফান্ড’ থিঙ্ক ট্যাঙ্কের বিশ্লেষক গ্যাব্রিয়েল মিচেলের মতে, এসব প্রকল্পে সময় লাগবে। আপাতত তেল ও গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত উপসাগরীয় স্থাপনা মেরামতে ভর্তুকি দেওয়া সবচেয়ে সহজ। তবে নতুন প্রকল্পগুলোকে ইইউ-এর পরিবেশবান্ধব নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। পাইপলাইনগুলো ভবিষ্যতে গ্যাস ও হাইড্রোজেন পরিবহনের ‘দ্বৈত-ব্যবহার’ ক্ষমতাসম্পন্ন হতে হবে।
অন্যতম প্রকল্প ‘গ্রেট সিজ ইন্টারকানেক্ট’ (জিএসআই) নামের বিদ্যুৎ কেবল। ১ হাজার ২০৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই লাইন মহাদেশীয় ইউরোপের বিদ্যুৎ গ্রিডকে সাইপ্রাস ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করবে। অর্থায়ন নিয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থাকলেও এটি সাইপ্রাস ও ইসরায়েলের জ্বালানি বিচ্ছিন্নতা ঘোচাতে এবং ভারতের সঙ্গে জ্বালানি সংযোগ স্থাপনে সক্ষম।
‘ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ’-এর সিনিয়র ফেলো গালিয়া লিন্ডেনস্ট্রস একে ‘আধুনিক জ্বালানি চাহিদার বাস্তবসম্মত সমাধান’ হিসেবে প্রশংসা করেছেন।
মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট জানান, যুক্তরাষ্ট্র পূর্ব ভূমধ্যসাগরকে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে দেখায় গ্রিস, সাইপ্রাস ও ইসরায়েলের জ্বালানি সম্পর্ক বাড়াতে কাজ করছে। তিনি হিউস্টনে ‘ইস্টার্ন মেডিটেরেনিয়ান এনার্জি সেন্টার’ উদ্বোধনকালে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত উন্নয়ন, মার্কিন তরলীকৃত গ্যাস পরিকাঠামো ও জ্বালানি পরিবহন নেটওয়ার্কে সহযোগিতা বৃদ্ধির কথা বলেন।


