বাজেট: অঙ্কের অরণ্যে গরিবের ক্ষুধা

বাজেট: অঙ্কের অরণ্যে গরিবের ক্ষুধা
Advertisement
Advertisement

সাতসকালে মাঠে যান প্রান্তিক কৃষক রহমত আলী। প্রচণ্ড রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে জমিতে ফসল ফলান। দিন শেষে বাজারে গিয়ে সারের চড়া দাম শোনেন। আড়তদারের সিন্ডিকেটে কম দামে ধান বেচতে বাধ্য হন। তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। ওদিকে শহরের দিনমজুর করিম মিয়া শেষ সম্বল দিয়ে এক কেজি চাল ও আলু কেনেন। করিম মিয়া আগামীকালের কাজের চিন্তায় মগ্ন। কাজ না মিললে তার ঘরের উনুন জ্বলবে না। রহমত আলী বা করিম মিয়া দেশের বাজেট বোঝেন না। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার অঙ্ক তাদের মাথায় ঢোকে না। তারা বোঝেন শুধু ক্ষুধার ভাষা। চান তিনবেলা পেট ভরে একটু ডাল-ভাতের নিশ্চয়তা।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অধিবেশন শুরু হয়েছে। প্রতি বছর এই আয়োজন ঘিরে চারদিকে উৎসবমুখর আলোচনা চলে। টেলিভিশন টকশো, পত্রিকার পাতা ও ব্যবসায়ী সংগঠনের বৈঠকে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলে। কর ছাড়, জিডিপি প্রবৃদ্ধি, ঘাটতি অর্থায়ন ও রাজস্ব আদায়ের বিশাল অঙ্ক টেবিলে ঘুরে বেড়ায়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট করেছে। নির্বাচিত নতুন সরকারের এটি প্রথম বাজেট। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছিল। ওই বাজেট পূর্ববর্তী অর্থবছরের চেয়ে সাত হাজার কোটি টাকা কম ছিল। এবার নির্বাচিত সরকার ব্যয়ের পরিধি বাড়িয়েছে। তবে দেশের শ্রমজীবী, দিনমজুর, কৃষক ও গরিব মানুষের কাছে এই জটিল সংখ্যার কোনো মূল্য নেই।

বাজেট শব্দটির সঙ্গে সাধারণ মানুষের সরাসরি সংযোগ নেই। একজন রিকশাচালক, দিনমজুর, পোশাককর্মী ও প্রান্তিক কৃষক প্রতিদিন সকালে জীবিকার টানে ছোটেন। দিন শেষে কত টাকা আয় হলো, চাল-ডাল-তেল কেনা যাবে কি না? এটুকুই তাদের জীবনের একমাত্র হিসাব। সংসদে নানা রকম অঙ্ক তুলে ধরে বাজেট পেশ করেন অর্থমন্ত্রী। বস্তি, ফুটপাত ও প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের কাছে এই সংখ্যাগুলো অবাস্তব রূপকথা। বিশাল অঙ্কের হিসাব তাদের জীবনের দৈনন্দিন কষ্ট কমাতে পারে না।

উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে ক্ষুধার কষ্ট ঢাকা যায় না। অর্থনীতিবিদরা সূচকের অগ্রগতি দেখাতে পারেন। সাধারণ মানুষের কাছে আসল সূচক বাজারের থলে। চালের কেজি কত, তেলের লিটার কত বা এক আঁটি শাকের দাম কত? এটাই তাদের আসল বাজেট। বিগত কয়েক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম অনেক বেড়েছে। সাধারণ মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ প্রতিদিনের খাবার তালিকা ছোট করছেন। ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে থাকাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সংসদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বাজেট পাস হয়। বাজারের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষ পকেটের হিসাব মেলান।

দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি ও কৃষক। বাজেটের জটিল সমীকরণে কৃষকের স্বার্থ আড়ালে চলে যায়। কৃষক মাঠে ফসল ফলান। তার কষ্টের কারণে দেশের মানুষ তিনবেলা ভাত খেতে পায়। কৃষকেরা বাজেট বোঝেন না। তারা বোঝেন সারের দাম, ডিজেলের দাম ও বীজের দাম। বাজেটে কৃষি খাতের ভর্তুকির সুফল প্রকৃত কৃষকের পকেটে যায় না। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে কৃষক ফসলের ন্যায্য মূল্য পান না। শহর ও গ্রামে ওই ফসলই মানুষকে চড়া দামে কিনতে হয়। কৃষকের এই দ্বিমুখী লোকসান বন্ধের উদ্যোগ বাজেটে দেখা যায় না।

সংসদের ভেতরে-বাইরে বাজেট আলোচনা বিশেষ শ্রেণির মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও আমলারা নিজেদের স্বার্থের হিসেব কষেন। পণ্যের শুল্ক ও কর ছাড় নিয়ে তদবির চলে। দেশের সিংহভাগ মানুষ শ্রমজীবী ও কৃষক। শ্রমজীবী মানুষের শ্রমের ওপর দেশের অর্থনীতি টিকে আছে। প্রবাসীদের রেমিট্যান্স ও পোশাকশ্রমিকদের ঘামে রিজার্ভ বাড়ছে। কৃষকের হাত ধরে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে। বাজেট প্রণয়নে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকে কম। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সামান্য বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে ওই বরাদ্দ প্রকৃত গরিব মানুষের হাতে পৌঁছায় না।

আরও পড়ুন

সাধারণ মানুষের চাওয়া সীমিত। তারা বিলাসবহুল জীবন চান না। মেগা প্রজেক্ট ও ফ্লাইওভার তাদের উপকারে আসে না। তারা একটু স্বস্তি চান। সকালে কাজে বেরিয়ে সন্ধ্যায় যেন পরিবারের জন্য ডাল-ভাত নিয়ে ফিরতে পারেন। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই চাওয়া পূরণ করা কঠিন। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য নেই। মজুরি বাড়ে ঢিমেতালে, বাজারের আগুন জ্বলে দাউ দাউ করে। কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ছে, কিন্তু আয় বাড়ছে না। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার নতুন বাজেট সাধারণ মানুষের মনে আশা জাগাতে পারবে? উল্টো নতুন করে জিনিসপত্রের দাম বাড়ার ভয় তৈরি করছে।

শ্রমজীবী ও কৃষক সমাজের কাছে বাজেটের সার্থকতা বাজারে গিয়ে স্বস্তি পাওয়ার মধ্যে। সরকার নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখলে সাধারণ মানুষ বুঝবেন বাজেট তাদের পক্ষে গেছে। চাল, ডাল, তেল, নুন, আলু ও পেঁয়াজের মতো অতি প্রয়োজনীয় জিনিস ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা জরুরি। টিসিবির মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য বিক্রির পরিধি বাড়ানো দরকার। প্রত্যন্ত অঞ্চলের গরিব মানুষ যেন এই সুবিধা পান।

বাজেট যেন শুধু ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির হাতিয়ার না হয়। দেশের অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ধনীদের ওপর কর বাড়িয়ে গরিবের পরোক্ষ করের চাপ কমাতে হবে। ভ্যাট বা পরোক্ষ করের বড় ভুক্তভোগী গরিব মানুষ। একটি সাবান বা শ্যাম্পু কিনতে কোটিপতি যে হারে ভ্যাট দেন, দিনমজুর ও কৃষকও একই হারে ভ্যাট দেন। এই বৈষম্য দূর করা দরকার। প্রত্যক্ষ কর আদায়ের ওপর জোর দিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে হবে। কৃষি খাতে উৎপাদন খরচ কমাতে সার, বীজ ও সেচের সরঞ্জামে সরাসরি নগদ প্রণোদনা দেওয়া উচিত। কৃষক যেন সরাসরি গুদামে ধান বিক্রি করতে পারেন।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের সরাসরি উপকারে আসে। সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলে দরিদ্র পরিবারকে ঋণগ্রস্ত হতে হয় না। সরকারি স্কুল-কলেজে মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ থাকলে গরিবের সন্তান ভাগ্য পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখে। প্রতি বছর এই দুই খাতে বরাদ্দ থাকে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক কম। অনুৎপাদনশীল খাতে খরচ কমিয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে খরচ বাড়ানো উচিত।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট কেবল সংখ্যার খেলা হয়ে না থাকুক। এবারের বাজেট কোটি কোটি শ্রমজীবী ও কৃষকের চোখের ভাষা বুঝুক। ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার চেয়ে সাধারণ মানুষের পেট ভরানো এখন বেশি জরুরি। খেটে খাওয়া মানুষ ভালো থাকলে অর্থনীতি এমনিতেই মজবুত হবে। কৃষক ফসলের ন্যায্য মূল্য পেলে, শ্রমিক সঠিক মজুরি পেলে ও বাজারের দাম স্বাভাবিক থাকলে তবেই বাজেটর সফল।

অর্থনীতির মূল উদ্দেশ্য মানুষের কল্যাণ। যে বাজেট মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারে না, তার কোনো নৈতিক ভিত্তি থাকে না। সরকারের উচিত বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে বাজেট বাস্তবায়ন করা। দিনমজুর, রিকশাচালক, পোশাকশ্রমিক ও কৃষকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নই হোক বাজেটের মূল লক্ষ্য। তিনবেলা পেট ভরে খাবারের নিশ্চয়তা দেওয়া রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। এবারের বাজেট এই দায়িত্ব পালনে সফল হবে। এটাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।

লেখক : সহসম্পাদক, টাইমস অব বাংলাদেশ

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad