মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদি। বুধবার ঢাকায় এক প্রেস ব্রিফিং-এ তিনি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অবস্থানকে ‘অস্পষ্ট’ বলে বর্ণনা করেন।
রাষ্ট্রদূত বলেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রেক্ষিতে তৈরি হওয়া সংঘাতে বাংলাদেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তবে ইরান আশা করেছিল বাংলাদেশ তাদের উদ্বেগের সঙ্গে ইরানের ওপর হামলাকারীদের নিন্দা জানাবে।
অবশ্য ইরান এরই মধ্যে বাংলাদেশের ছয়টি জাহাজকে হরমুজ প্রনালি পার হওয়ার অনুমতি দিয়েছে।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও বাহরাইনে হামলায় উদ্বেগ প্রকাশ করে।
অবশ্য ইরানি কর্মকর্তারা স্বীকার করেন, বাংলাদেশের এই অবস্থানের পেছনে অর্থনৈতিক স্বার্থ কাজ করছে। বিশেষ করে আরব দেশগুলোতে লাখ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিকের কর্মসংস্থানের বিষয়টি ঢাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে বাংলাদেশ ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখাকে অগ্রাধিকার দিলেও তেহরান চায় ঢাকা যেন পাকিস্তান বা তুরস্কের মতো আরও স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করে।
হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ
এদিকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালির বর্তমান আইনি মর্যাদা পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটিকে তারা ‘ট্রানজিট প্যাসেজ’ বা উন্মুক্ত যাতায়াত পথ থেকে ‘ইনোসেন্ট প্যাসেজ’ বা নিরীহ যাতায়াত পথে রূপান্তর করতে চাইছে। ইরানের এই পদক্ষেপ বৈশ্বিক জাহাজ চলাচল ব্যবস্থা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদি জানান, তার দেশের পার্লামেন্ট বা মজলিসে এই নৌপথের আইনি মর্যাদা নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই প্রস্তাব কার্যকর হলে বিশ্বের অন্যতম প্রধান এই সামুদ্রিক প্রবেশপথের ওপর ইরানের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে।
বর্তমানে ১৯৮২ সালের জাতিসংঘ সমুদ্র আইন অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি একটি ট্রানজিট প্যাসেজ হিসেবে স্বীকৃত। এই নিয়মের অধীনে বাণিজ্যিক জাহাজ, যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিনসহ সব দেশের নৌযান কোনো পূর্বানুমতি ছাড়াই নিরবচ্ছিন্নভাবে এই পথ দিয়ে যাতায়াত করতে পারে। ইরান এই কনভেনশনে স্বাক্ষর করলেও তাদের পার্লামেন্ট সেটি এখনো অনুমোদন করেনি।
রাষ্ট্রদূত জানান, এই আইনি সুযোগটি ব্যবহার করেই তেহরান এখন ‘ইনোসেন্ট প্যাসেজ’ ব্যবস্থা চালুর পথে হাঁটছে। এই নতুন ব্যবস্থার আওতায় যেকোনো জাহাজকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার আগে ইরানি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পূর্বানুমতি নিতে হবে এবং তাদের সাথে সমন্বয় করতে হবে। এটি বর্তমানের অবাধ যাতায়াত ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত একটি প্রক্রিয়া।
রাষ্ট্রদূত বলেন, নতুন এই ব্যবস্থায় যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিনসহ কোনো নৌযানই ইরানের অনুমতি ছাড়া এই প্রণালি পার হতে পারবে না।
তিনি আরও দাবি করেন, ইরান বর্তমানেও কার্যত এই পথে যাতায়াতকারী নৌযানগুলোর ওপর ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছে। তার দেওয়া তথ্যমতে, বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির আগে প্রতিদিন প্রায় ১৩০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালী পার হতো। তবে বর্তমানে এই সংখ্যা কমে মাত্র ১২টিতে দাঁড়িয়েছে এবং প্রতিটি জাহাজই অনুমতি নিয়ে যাতায়াত করছে।
রাষ্ট্রদূত জানান, বর্তমানে শত শত জাহাজ ইরানের অনুমতির অপেক্ষায় আছে। এই পথ দিয়ে প্রতিদিন তেলের সরবরাহও আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। আগে প্রতিদিন প্রায় এক কোটি ১০ লাখ ব্যারেল তেল এই পথে পরিবহন করা হতো।
বৈশ্বিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনের প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। পারস্য উপসাগর থেকে তেল রপ্তানির জন্য হরমুজ প্রণালি বিশ্বের প্রধান ধমনী হিসেবে পরিচিত। এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে চলে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। এছাড়া নতুন প্রশাসনিক আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক শর্তের কারণে জাহাজ চলাচলের খরচ এবং সময় অনেক বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কৌশলগতভাবে এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ইরান ওই অঞ্চলে তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে চায়। এর ফলে তেহরান তাদের শত্রু হিসেবে বিবেচিত বিদেশি নৌবাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনে সীমিত করার ক্ষমতা পাবে।
রাষ্ট্রদূত জাহানাবাদি মনে করেন, এই পরিবর্তনের ফলে হরমুজ প্রণালি একটি উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক নৌপথ থেকে ইরানের সার্বভৌমত্বের অধীনে থাকা একটি নিয়ন্ত্রিত করিডোরে পরিণত হবে। এই পথে যাতায়াত অনেকটা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করবে।


