চাঁপাইনবাবগঞ্জের বরেন্দ্র অঞ্চলের মাঠজুড়ে এখন আমন ধানের চারা রোপণে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। কেউ জমি প্রস্তুত করছেন, আবার কেউ ব্যস্ত রয়েছেন চারা রোপণের কাজে। তবে আষাঢ় শেষ হয়ে শ্রাবণ শুরু হলেও কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির দেখা মিলছে না।
কৃষকদের মতে, চাঁপাইনবাবগঞ্জে যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে, তা আমন চাষের জন্য পর্যাপ্ত নয়। ফলে শুরুতেই আমন আবাদে গভীর নলকূপের পানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা তাদের উৎপাদন খরচ অনেকটাই বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সরেজমিনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার মহাডাঙ্গা এলাকা এবং নাচোল উপজেলার নেজামপুর ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায় আমন চাষের নানা দৃশ্য। কোথাও জমিতে মই দেওয়া হচ্ছে, কোথাও গভীর নলকূপের পানি ছেড়ে জমিতে কাদা তৈরি করা হচ্ছে, আবার কোথাও শ্রমিকেরা সারিবদ্ধভাবে চারা রোপণ করছেন।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সম্প্রতি কয়েক দিন কিছুটা বৃষ্টি হলেও তা আবাদের চাহিদার তুলনায় সামান্য। ফলে আমন মৌসুমে শুরু থেকেই সেচের ওপর ভরসা করতে হচ্ছে, যা জমি প্রস্তুতি ও চারা রোপণের সামগ্রিক ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
কৃষকেরা জানান, একসময় বরেন্দ্র অঞ্চলে আমন ধানের আবাদ ছিল পুরোপুরি বৃষ্টিভিত্তিক। বর্ষার পানিতেই পর্যাপ্ত কাদা তৈরি হতো এবং অনায়াসেই চারা রোপণ শেষ হতো। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে বৃষ্টিপাত আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় গভীর নলকূপের পানি ছাড়া এখন আমন চাষ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যমতে, গত ছয় বছরে জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসে এই অঞ্চলে গড় বৃষ্টিপাত ধারাবাহিকভাবে কমেছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষিতে, যার ফলে আমনের মতো বৃষ্টিনির্ভর ফসলও এখন দিন দিন সেচনির্ভর হয়ে উঠছে।
বৃষ্টির সংকটে আবাদের সার্বিক চিত্র তুলে ধরে নাচোল উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামের কৃষক মনিরুল ইসলাম জানান, তিনি এবার ১০ বিঘা জমিতে আমনের আবাদ করছেন। এর মধ্যে ছয় বিঘা জমিতে আবাদ করতে তাকে পুরোপুরি সেচের পানির ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। বাকি চার বিঘা জমিতে কিছুটা বৃষ্টির পানি পেয়েছেন।
তিনি বলেন, প্রতি বিঘা জমিতে সেচ বাবদ ৬২৫ টাকা, শ্রমিক বাবদ প্রায় ৪ হাজার টাকা এবং চারা রোপণসহ অন্যান্য আনুসঙ্গিক কাজে আরও প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা ব্যয় হচ্ছে। এভাবে আগের তুলনায় ধান উৎপাদনের মোট খরচ অনেক বেড়ে গেছে।
কৃষকদের মতে, সেচের খরচের পাশাপাশি দিন দিন শ্রমিকের মজুরি, সার, বীজ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের দাম বাড়ছে। কিন্তু সে অনুযায়ী বাজারে ধানের দাম না বাড়ায় তাদের লাভের মুখ দেখা দায় হয়ে পড়েছে।
উৎপাদন খরচ এবং ধানের বাজারমূল্য নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে শাহিন আলী নামে আরেক কৃষক জানান, ধান চাষ করতে যে পরিমাণ খরচ হয়, তাতে খুব বেশি লাভ থাকে না। হিসাব করলে লাভ সামান্যই থাকে বা খরচ এবং আয় সমান সমান হয়ে যায়।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সারা বছর ধরে নিজের জমিতে যে শ্রম দেন, সেই বাড়তি সামান্য টাকাটাই মূলত তাদের দিনমজুরি হিসেবে থেকে যায়। এর বাইরে ধান চাষে লাভ বলতে আর কিছুই থাকে না।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আতিকুল ইসলাম জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় ৫৩ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেচ সংকট সত্ত্বেও কৃষকদের প্রচেষ্টায় এখন পর্যন্ত ৩২ হাজার ৪৯০ হেক্টর জমিতে আবাদ সম্পন্ন হয়েছে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার শতকরা ৫৮ ভাগ।


