লেখক, গবেষক ও বামপন্থী বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমর আর নেই। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর।
দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। রোববার সকালে অবনতি হওয়ায় তাকে ঢাকার বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে সকাল ১০টা ৫ মিনিটে তার মৃত্যু হয়। জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সম্পাদক ফয়জুল হাকিম সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
উমর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) -এর নেতা হিসেবে দীর্ঘ সময় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ২০২৫ সালে তিনি দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হলেও তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন।

তার মৃত্যুতে দেশের শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
অধ্যাপক ও লেখক আজফার হোসেন তার মৃত্যুতে শোক জানিয়ে ফেসবুক পোস্টে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ লেখক শিবিরের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসাবে বেশ কয়েক বছর কাজ করার কারণেই উমর ভাইয়ের একেবারে কাছাকাছি আসার সুযোগ ও সৌভাগ্য হয়েছিলো। সে সময়ে আমাদের সংগঠনের হয়ত সবচাইতে সক্রিয় মানুষটা ছিলেন ওই সংগঠনেরই সহ-সভাপতি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। না বলে পারছি না যে, সেই সময়টা ছিল বাংলাদেশ লেখক শিবিরের ইতিহাসে এক উত্তাল, দারুণ তাৎপর্যময় অধ্যায়।’
তিনি বলেন, ‘বেশ কিছু কথা মনে পড়ছে আবারও। অক্সফোর্ডে-পড়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা-দেওয়া, বাংলাদেশের কৃষক-শ্রমিকের পক্ষে সার্বক্ষণিক রাজনীতি-করা এই বদরুদ্দীন উমর বাসে চলাফেরা করতেন। একদিন আমি আমাদের পুরানা পল্টনের লেখক শিবিরের অফিস থেকে বাসে করে তাঁকে নিয়ে যাচ্ছি তার মিরপুরের বাসায়। তখন কথায় কথায় জানতে পারলাম বাংলাদেশের “পুরস্কার” নিয়ে তার জীবনের গল্প।’
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) মহাপরিচালক ও লেখক ফারুক ওয়াসিফ তার ফেসবুক পোস্টে বলেছেন, ‘গণঅভ্যুত্থানবাদী, আমৃত্যু কমিউনিস্ট মানুষটি ২০২৪ এর জুন মাসের ৭ তারিখে তার সম্পাদিত “সংস্কৃতি” পত্রিকায় লিখেছিলেন, “আওয়ামী লীগকে মেরে তাড়াতে হবে”। তিনিই প্রথম জুলাই আন্দোলনকে উপমহাদেশের অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।’
‘সেই বদরুদ্দীন উমর আজ (রোববার) অসীম জীবনে পা দিলেন। দেশভাগের শিকার এই পা পশ্চিম বাংলা থেকে কৃষক সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলন, উনসত্তর-একাত্তর পেরিয়ে বাংলাদেশ অবধি হাঁটছে। এই পা জোড়া একজন কমিউনিস্টের। মস্তিষ্কটাও কমিউনিস্টেরই। দেশভাগের শিকারদের একজন। তবু শিথিল আবেগে জাতীয়তাবাদী না হয়ে হয়েছেন সাধারণ মানুষের মুক্তির পক্ষের সওয়ালকারী,’ বলেন ফারুক।
তিনি আরো বলেন, ‘জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবীরা যখন দেশের যুগান্তকারী আন্দোলনগুলোকে ভক্তির শামিয়ানায় মুড়ে রাখছিলেন, উমর তখন ঢাকনা খুলে দেখান কিসের তরে মানুষের এত বিদ্রোহ; জনগণের কোন অংশ তাতে শক্তি জোগাল; দুর্বলতাটা কোথায় ছিল বলে আজও মুক্তি আসেনি। ভাষা আন্দোলন থেকে আজ অবধি তাঁকে কেউ ক্ষমতার তাপে গলে যেতে দেখেনি, লাভের আশায় নুইয়ে পড়তে দেখেনি। বার্ধক্য অনেকের শরীর ও মনের শিরদাঁড়া বাঁকা করে ফেলে, অথচ এই নব্বইয়েও উমর ইতিহাসের সামনে সততা ও মনীষা নিয়ে খাড়া ছিলেন।’

‘ঢাকার শ্যামলীর স্পেশালাইজড হাসপাতালে তিনি এখন শায়িত আছেন,’ উল্লেখ করেন তিনি।
উমর ১৯৩১ সালের ২০ ডিসেম্বর ব্রিটিশ ভারতের বর্ধমান শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আবুল হাশিম এবং মাতার নাম মাহমুদা আখতার মেহেরবানু বেগম। পিতার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি সাম্যবাদী হলেও পাকিস্তান সৃষ্টির বিরোধিতা সত্ত্বেও ১৯৫০ সালে পরিবারসহ পূর্ব পাকিস্তানে আসেন এবং ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
শিক্ষাজীবন শুরু করেন বর্ধমান টাউন স্কুল থেকে ১৯৪৮ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়ে। ১৯৫০ সালে বর্ধমান রাজ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৩ সালে দর্শনে স্নাতক সম্মান এবং ১৯৫৫ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬১ সালে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিলোসফি, পলিটিক্স অ্যান্ড ইকোনমিক্স (পিপিই) ডিগ্রি অর্জন করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে তিনি কর্মজীবন শুরু করেছিলেন বদরুদ্দীন উমর। পরবর্তীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। বাংলাদেশ লেখক শিবিরের সাবেক সভাপতি, মাসিক প্রবন্ধ পত্রিকা ‘সংস্কৃতি’র প্রতিষ্ঠা, কৃষক ফেডারেশনের সভাপতি এবং গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোটের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী ছিলেন বদরুদ্দীন উমর।
পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতেও তার অবস্থান ছিল। ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সভাপতি ছিলেন তিনি।



