নতুন বছরের প্রথম সকাল। ক্যালেন্ডারের পাতায় নতুন তারিখের সঙ্গে শিশুদের চোখে থাকে নতুন বই পাওয়ার প্রত্যাশা। এবছর পরিবেশ ছিল কিছুটা ভিন্ন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ঘোষিত তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোকের কারণে ছিল না কোনো আনুষ্ঠানিকতা কিংবা উৎসবের আয়োজন।
তবে বছরের প্রথম দিনেই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে গেছে নতুন পাঠ্যবই। অনাড়ম্বর পরিবেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে ঐতিহ্যবাহী নতুন বই বিতরণ। ঝকঝকে নতুন বই হাতে পেয়ে আনন্দিত শিক্ষার্থীরা। নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে বই-ই হয়ে উঠেছে শিশুদের সবচেয়ে বড় আনন্দের উপলক্ষ।
বরিশালে নতুন বই হাতে উচ্ছাসিত শিক্ষার্থীরা
বছরের শুরুতেই বরিশালের প্রার্থমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে নতুন বই। শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেয় বিদ্যালয় কতৃপক্ষ। এতেই উল্লসিত শিক্ষার্থীরা।
বরিশাল জেলায় প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে এক হাজার ৫৮৮ টি বিদ্যালয়ে এ বছর বইয়ের চাহিদা ১১ লাখ ৬৭ হাজার ২০৮টি। এর মধ্যে ১১ লাখ ৬৪ হাজার ৬০০ নতুন বই এরই মধ্যে পৌঁছে গেছে। বাকি ২ হাজার ৬০৮টি বই শিগগির চলে আসবে বলে আশাবাদী বরিশাল প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল।
বরিশাল বিভাগে মাধ্যমিক স্তরে বইয়ের মোট চাহিদা ৬৯ লাখ ৬১ হাজার ৯৩০ টি। এর মধ্যে মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা ৪৭ লাখ ১০ হাজার ৫০৩ টি বই বুঝে পেয়েছেন। এবং মোট বিতরন হবে ৪৬ লাখ ৩২ হাজার ৭২৬টি বই।
এছাড়া কারিগরি ট্রেড, দাখিল, ভোকেশনাল সহ অনান্য স্তরের মোট চাহিদা ১ কোটি ৩৮ লাখ ৭০ হাজার ৬৪৬ টি। আর এখন পর্যন্ত ১ কোটি ১৮ হাজার ৪৭৭ টি বই পাওয়া গেছে যা সব বইয়ের ৭৩ দশমিক ২৩ ভাগ বলে জানিয়েছেন জেলা প্রার্থমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর হোসেন।
এর সঙ্গে কারিগরি ট্রেড, দাখিল, ভোকেশনাল সহ অনান্য স্তরের মোট বইয়ের চাহিদা ১ কোটি ৩৮ লাখ ৭০ হাজার ৬৪৬ টি আর প্রাপ্তি ১ কোটি ১৮ হাজার ৪৭৭ টি। যার ৭৩ দশমিক ২৩ ভাগ নতুন বই পৌঁছেছে বলে জানান তিনি।
বরিশাল জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম জানান, কোন আয়োজন করা হয়নি। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে বসে সকল শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেয়া হয়েছে। নতুন বছরের শুরুতে বই পেয়ে খুশি শিক্ষার্থীরা। এতে আগামীতে একটি ভালো ফলাফল পাওয়ার আশা শিক্ষার্থীদের।
মাগুরায় নতুন বইয়ের ঘ্রাণে শুরু নতুন বছর
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বৃহস্পতিবার মাগুরা জেলার সব প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও সমমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন পাঠ্যবই তুলে দেওয়া হয়। বই নিতে সকাল থেকেই স্কুল চত্বরে ভিড় জমায় ছোট-বড় শিক্ষার্থীরা। কারও হাতে সদ্য ছাপা বইয়ের গন্ধ, কারও চোখে কৌতূহল।
জেলা শিক্ষা অফিসের সূত্র মতে, মাগুরা জেলায় সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ৫০৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর মধ্যে বই বিতরণ করা হয়েছে। এর সঙ্গে মাধ্যমিক পর্যায়ে জেলার ১৭৫টি বিদ্যালয়, ৭৪টি মাদরাসা ও ১০টি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দুই লাখের বেশি শিক্ষার্থীর মাঝেও নতুন বই পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। তবে ভর্তি প্রক্রিয়া এখনো চলমান থাকায় শিক্ষার্থীর চূড়ান্ত সংখ্যা জানাতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

মাগুরা সদরের নরিহাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেখা যায় স্কুল মাঠে মাটিতে বসে দল বেঁধে নতুন বই উল্টেপাল্টে দেখছে শিশুরা। কেউ ছবিতে মগ্ন, কেউবা যত্ন করে নাম লিখছে বইয়ের পাতায়। শিক্ষার্থীরা জানায়, বছরের প্রথম দিনেই নতুন বই হাতে পেয়ে তাদের আনন্দের সীমা নেই।
রাজশাহীতে বছরের প্রথম দিনই নতুন বই পেল শিক্ষার্থীরা
রাজশাহীতে বছরের প্রথম দিনই নতুন বই হাতে পেল শিক্ষার্থীরা। বছরের প্রথম দিনে সারাদেশের মতো রাজশাহীতেও শুরু হয়েছে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনামূল্যে নতুন শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই বিতরণ।
বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়া হয়।
নওহাটা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা জানান, নতুন বছরের প্রথম দিনেই বই পেয়ে খুব খুশি তারা। এখন থেকে পড়াশোনা শুরু করতে পারবে। নতুন বছরে কোনো উৎসব না হলেও বই পেয়ে খুব খুশি শিক্ষার্থীরা।

বিদ্যালয় প্রধান ওমর আলী জানান, শিক্ষাবর্ষের শুরুতে বই হাতে না পেলে পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটে। পাঠ্যবই থাকলে শিক্ষার্থীরা ক্লাসের পাঠ অনুসরণ করতে পারে এবং বাড়িতে পড়াশোনার পরিকল্পনা করতে সুবিধা হয়। সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বই এখনো আসেনি তবে জানুয়ারির মধ্যেই সব বই পৌঁছানোর আশা করেন তিনি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্র জানায়, প্রাক্-প্রাথমিকের মোট ৪১,৬২৬টি এবং প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির ১১,১৯,২০৪টি বই ইতোমধ্যেই বিদ্যালয়ে পৌঁছেছে। ফলে জেলার সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শতভাগ শিক্ষার্থীর হাতে বিনামূল্যে পাঠ্যবই পৌঁছে যাচ্ছে।
মাধ্যমিক পর্যায়ে বই সরবরাহে এখনও ঘাটতি রয়েছে। ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির ২৩ লাখ ৩৫ হাজার ৪৬৫ কপি বইয়ের মধ্যে ৯ লাখ ৭৮ হাজার ৬৭৫ কপি বিতরণ হয়েছে। এসএসসি ভোকেশনাল পর্যায়ে ২ লাখ ৯০ হাজার ৮০ কপি বইয়ের মধ্যে এক লাখ ৯৩ হাজার ৩০০ কপি এবং দাখিল-ইবতেদায়ি পর্যায়ে ১০ লাখ ৬৯ হাজার ১০১ কপি বইয়ের মধ্যে ৬ লাখ ৩৬ হাজার ১৭১ কপি বিতরণ করা হয়েছে। অবশিষ্ট বই ১৫ জানুয়ারির মধ্যে বিতরণ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড সূত্র জানায়, প্রাক্-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণির ৮ কোটি ৫৯ লাখ ২৫ হাজার ৩৭৯ কপি বই ছাপা ও বিতরণের জন্য উপজেলায় পাঠানো হয়েছে। মাধ্যমিক, দাখিল, ভোকেশনাল ও কারিগরি স্তরের ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির ১৮ কোটি ৩২ লাখ ৮ হাজার ৬৯৩ কপি বইয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশের ছাপা শেষ এবং ৫৮ শতাংশের বেশি বই ইতোমধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বছরের শুরুতেই বই হাতে পাওয়া শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস ও পড়াশোনার আগ্রহ বাড়ায়। তাই অবশিষ্ট বই দ্রুত বিতরণ নিশ্চিত করা শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।


