গত বছর জুলাই–আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া সাজাপ্রাপ্ত ৬ জঙ্গি এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। একই সময়ে বিভিন্ন কারাগার থেকে লুট হওয়া ১৮টি আগ্নেয়াস্ত্র এখনো উদ্ধার করা যায়নি। এছাড়া গত আট মাসে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন জঙ্গি সংশ্লিষ্টতায় অভিযুক্ত প্রায় ২০০ বন্দি, যাদের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে আইন–শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে কোনো হালনাগাদ তথ্য নেই।
এই পরিস্থিতি নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। যদিও সরকারের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং আইন–শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বারবার আশ্বস্ত করছে, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণে আছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী একাধিকবার বলেছেন, দেশে জঙ্গিবাদের কোনো সুযোগ নেই। পুলিশের অ্যান্টি–টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিমও দাবি করেছেন, দেশে বর্তমানে কোনো জঙ্গি তৎপরতা নেই।
মাঠের বাস্তবতা:
গত দেড় বছরে এটিইউ বা ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের পক্ষ থেকে জঙ্গিবিরোধী বড় ধরনের কোনো অভিযানের খবর পাওয়া যায়নি। আইন–শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে নজরদারি ও গোয়েন্দা সমন্বয়ে কিছুটা শিথিলতা রয়েছে। এর মধ্যেই গত শুক্রবার ঢাকার কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদে উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায় একটি বিস্ফোরণের ঘটনা জঙ্গি হুমকির বিষয়টি আবার সামনে এনেছে।
বিস্ফোরণের পর মাদ্রাসার পরিচালক শেখ আল আমিন (৩২) আত্মগোপন করেছেন। পুলিশের দাবি, নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন ‘নব্য জেএমবি‘র সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে এবং তিনি আগেও জেল খেটেছেন। পুলিশ এই ঘটনাকে জঙ্গি তৎপরতার একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে।
বিশ্লেষকদের সতর্কতা:
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) সভাপতি মেজর জেনারেল(অব.) এ এন এম মুনিরুজ্জামান জানান, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ সমস্যা এখনো সমাধান হয়নি। বরং এটি আরও জটিল হয়েছে। তিনি বলেন, কারাগার থেকে পালানো অনেক জঙ্গিকে এখনো ধরা যায়নি এবং লুট হওয়া অস্ত্রও উদ্ধার হয়নি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কথা উল্লেখ করে তিনি পুলিশ বাহিনীর বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর নজরদারি আরও বাড়ানোর পরামর্শ দেন।
সরকারি বক্তব্য:
এটিইউ প্রধান মো. রেজাউল করিম জানান, পালিয়ে যাওয়া কয়েদি এবং জামিনে মুক্ত জঙ্গিদের ওপর কড়া নজরদারি রাখা হচ্ছে। সিটিটিসি প্রধান মাসুদ করিমও জানান, পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার এবং তাদের গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে।
আগস্টের পর গণজামিন আদালত ও কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্টের পর স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ৩৪৬ জন বন্দি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। এই তালিকায় ১২ জন শীর্ষ সন্ত্রাসী, ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার ৮ আসামি এবং অন্তত ১০টি ভিন্ন সংগঠনের সদস্য রয়েছেন। গত আট মাসে নিষিদ্ধ ঘোষিত জেএমবি–র ১৪৮ জন সদস্য জামিন পেয়েছেন। এছাড়া আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, হিজবুত তাহরীর, আনসার আল ইসলাম এবং কুকি–চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) মতো সংগঠনের সদস্যরাও এই তালিকায় আছেন।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো ব্লগার রাজিব হায়দার হত্যা মামলায় ৫ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের কথিত প্রধান জসিম উদ্দিন রাহমানীর মুক্তি। কারাগার থেকে বের হওয়ার পর তিনি দাবি করেছেন, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নামে কোনো সংগঠনের অস্তিত্বই ছিল না।
কারাগারে হামলা ও পলায়ন:
কারা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত বছর জুলাই–আগস্টের আন্দোলনের সময় দেশের ৬৮টি কারাগারের মধ্যে ১৭টি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৬টি কারাগার। এছাড়া ৫টি কারাগার থেকে মোট দুই হাজার ২৩২ জন বন্দি পালিয়ে যায়, যাদের মধ্যে ৮৮ জন ছিল মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। বর্তমানে ৭০০ জনেরও বেশি বন্দি নিখোঁজ, যার মধ্যে ৬ জন সাজাপ্রাপ্ত দুর্ধর্ষ জঙ্গি।
কারাগারে হামলার সবচেয়ে বড় ঘটনা ছিল নরসিংদীতে। সেখানে আগুন দিয়ে কারাগার পুড়িয়ে দেওয়া হয়। নরসিংদী কারাগার থেকে পালিয়ে যায় সর্বোচ্চ ৮২৬ বন্দি। এরপরই ছিল শেরপুর কারাগারের অবস্থান. সেখান থেকে ৫১৮ বন্দি পালিয়ে যায়। এছাড়া কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে পালিয়েছিল ২০৯ জন দুর্ধর্ষ বন্দি।
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পালিয়ে যাওয়া কয়েদিদের অনেকের বিরুদ্ধেই ডাকাতি, হত্যা, অস্ত্রপাচার, মাদক ব্যবসা, ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া এদের মধ্যে জঙ্গি তৎপরতার দায়ে দণ্ডিত এবং অভিযুক্ত আসামীও রয়েছে।
কারাগারে হামলার সময় লুট হয়েছিল ৮৫টি আগ্নেয়াস্ত্র। এর মধ্যে ৬৭টি উদ্ধার হলেও ১৮টি অস্ত্র এবং বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ এখনো উদ্ধার করা যায়নি।
কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মোহাম্মদ মোতাহার হোসেন গত ১৭ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, পালিয়ে যাওয়া দুই হাজার ২০০ বন্দির মধ্যে দেড় হাজার বন্দিকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। তবে এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে প্রায় ৭০০ বন্দি।


