ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৩৭ মিনিটে মিন্দানাও অঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় এই ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এতে বেশ কয়েকটি বহুতল ভবন ধসে পড়েছে এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত তিনজন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। একইসঙ্গে উপকূলীয় এলাকায় জারি করা হয়েছে সুনামি সতর্কতা।
ফিলিপাইন ইনস্টিটিউট অব ভলকানোলজি অ্যান্ড সিসমোলজি (ফিভলকস) জানিয়েছে, স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৩৭ মিনিটে আঘাত হানা ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল জেনারেল সান্তোস শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমে সমুদ্রে, প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে। কোটাবাটো ট্রেঞ্চে ভূত্বকের সঞ্চালনের কারণে এ কম্পনের সৃষ্টি হয়। সংস্থাটির পরিচালক তেরেসিতো বাকোলকোল জানান, ভূমিকম্পটির গভীরতা ছিল প্রায় ১০ কিলোমিটার।
ভূমিকম্পের পর ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র সুনামি-ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ উঁচু স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে প্রতিবেশী ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াও তাদের উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য সুনামি সতর্কতা জারি করেছে।
তবে সাত লাখের বেশি মানুষের বসবাসকারী এবং দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র জেনারেল সান্তোস শহরে অন্তত একটি ছোট ভবন ধসে পড়েছে। এছাড়া আরও কিছু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কেউ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছেন কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, “এটি একটি বড় ধরনের ভূমিকম্প। আমরা ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছি এবং ইতোমধ্যে বিভিন্ন ভিডিওতে কয়েকটি ভবনের ক্ষতির চিত্র দেখা গেছে।”
রাজধানী ম্যানিলাভিত্তিক ডিজেডআরএইচ রেডিও জানিয়েছে, জেনারেল সান্তোসে তাদের স্থানীয় কার্যালয় থাকা একটি চারতলা বাণিজ্যিক ভবনের অংশ ধসে পড়ে। তবে ভবনের কর্মীরা দ্রুত নিচতলায় নেমে আসতে সক্ষম হওয়ায় কেউ আহত হননি।
এ ছাড়া বিভিন্ন ভবন থেকে কংক্রিট ও ধ্বংসাবশেষ নিচে পড়ে পার্কিংয়ে থাকা ট্রাইসাইকেল ট্যাক্সির ক্ষতি করেছে।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় সুনামি সতর্কীকরণ কেন্দ্র (পিটিডব্লিউসি) জানিয়েছে, ফিলিপাইনের কিছু উপকূলে সর্বোচ্চ তিন মিটার উচ্চতার সুনামি ঢেউ আঘাত হানার আশঙ্কা রয়েছে। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার কিছু উপকূলে এক মিটার পর্যন্ত ঢেউ সৃষ্টি হতে পারে।
ফিভলকসের পরিচালক বাকোলকোল জানান, সুলতান কুদারাত ও সারাঙ্গানি প্রদেশে স্থাপিত সুনামি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলো প্রায় এক মিটার উচ্চতার ঢেউ রেকর্ড করেছে। আরও কয়েকটি এলাকায় তুলনামূলক ছোট ঢেউ শনাক্ত হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট মার্কোস বলেন, “সুনামি সতর্কতাকে গুরুত্ব দিন। এখনই উঁচু স্থানে চলে যান। অপেক্ষা করবেন না। পেছনে ফেলে আসা যেকোনো কিছুর চেয়ে আপনার জীবন বেশি মূল্যবান।”
তিনি আরও জানান, জাতীয় সরকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং দুর্যোগ মোকাবিলা সংস্থাগুলোকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
মালয়েশিয়ার আবহাওয়া বিভাগ বোর্নিও দ্বীপের সাবাহ অঙ্গরাজ্যের জন্য সুনামি সতর্কতা জারি করেছে। অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপের উপকূলে স্থাপিত একটি পরিমাপক যন্ত্রে ৮৩ সেন্টিমিটার উচ্চতার সুনামি ঢেউ রেকর্ড করা হয়েছে।
ভূমিকম্পের প্রভাবে তাইওয়ান, জাপান, পাপুয়া নিউগিনি এবং পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দ্বীপ রাষ্ট্রেও সমুদ্রপৃষ্ঠের অস্বাভাবিক পরিবর্তনের আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের গুয়ামের জন্য জারি করা সতর্কতা প্রায় দুই ঘণ্টা পর প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং হাওয়াইয়ের জন্য কোনো ঝুঁকি নেই বলে জানিয়েছে পিটিডব্লিউসি।
মূল ভূমিকম্পের পর এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬টি আফটারশক রেকর্ড করা হয়েছে। এসব কম্পনের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ১ দশমিক ৩ থেকে সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ৭। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, মূল ভূমিকম্পের পর সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ৫ মাত্রার একাধিক আফটারশক অনুভূত হয়েছে। সংস্থাটি মূল ভূমিকম্পের গভীরতা ৫৫ কিলোমিটার বলে উল্লেখ করেছে। বিভিন্ন সংস্থার পরিমাপে সামান্য পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’-এর ওপর অবস্থানের কারণে ফিলিপাইন বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। দেশটিতে প্রায়ই শক্তিশালী ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটে। এ ছাড়া প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২০টি টাইফুন ও ক্রান্তীয় ঝড়ের আঘাতও মোকাবিলা করতে হয় দেশটিকে।


