মালদ্বীপে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মো. নাজমুল ইসলাম মালদ্বীপের স্বরাষ্ট্র, শ্রম ও প্রযুক্তিমন্ত্রী আলী ইহুসানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। সাক্ষাতে মালদ্বীপে কর্মরত ও বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের কল্যাণ, নিয়মিতকরণ ও বৈধকরণের এবং সামগ্রিক জীবনমান উন্নয়নের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় হয়।
বৈঠকে বিশেষভাবে বায়োমেট্রিক নিবন্ধন, অনথিভুক্ত প্রবাসীদের নিয়মিতকরণ, কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবা, রেমিট্যান্স সুবিধা এবং প্রবাসীদের সার্বিক কল্যাণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। বুধবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
উভয় পক্ষই মালদ্বীপের অর্থনীতি ও সমাজে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদানের কথা উল্লেখ করে তাদের কল্যাণে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
বায়োমেট্রিক নিবন্ধন ও নিয়মিতকরণে অগ্রগতি
সাক্ষাৎকালে মন্ত্রী আলী ইহুসান হাইকমিশনারকে জানান, মালদ্বীপে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের প্রায় ৯৮ শতাংশের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে। বিদেশি কর্মীদের নিবন্ধন ও তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এটি মালদ্বীপ সরকারের একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এ অর্জনের জন্য হাইকমিশনার মন্ত্রী ও তার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিনন্দন জানান। তিনি উল্লেখ করেন, বায়োমেট্রিক নিবন্ধন ও তথ্য যাচাইয়ের কার্যক্রম প্রবাসীদের নিয়মিতকরণ এবং তাদের আইনগত অবস্থান সুসংহত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এর মাধ্যমে প্রবাসীদের সরকারি সেবাপ্রাপ্তি, কর্মসংস্থানসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ এবং সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করার সুযোগ আরও সম্প্রসারিত হবে।
নিয়মিতকরণের ও বৈধকরণের সুযোগ
বৈঠকে অনথিভুক্ত প্রবাসীদের নিয়মিতকরণের ও বৈধকরণের বিষয়ে বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা নিয়েও আলোচনা হয়।
মন্ত্রী জানান, আনুষ্ঠানিক নিয়মিতকরণ ও বৈধকরণের কার্যক্রমের নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হলেও কোনো প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে কর্মরত এমন ব্যক্তিদের জন্য, যাদের অভিবাসন বা কর্মসংস্থানসংক্রান্ত তথ্য ও নথিপত্র অসম্পূর্ণ রয়েছে, নিয়মিতকরণের সুযোগ থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নিয়োগকর্তা কর্মীর পক্ষে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ, লেবার রিলেশনস অথরিটি অথবা নিজ নিজ সিটি কাউন্সিলের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে।
হাইকমিশনার এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য বিনিময়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যাতে প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মী ও নিয়োগকর্তারা বিদ্যমান নিয়মিতকরণ ও বৈধকরণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে যথাযথভাবে অবগত হতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন।
মন্ত্রী বিদেশি কর্মী নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে গৃহীত বিভিন্ন ব্যবস্থার বিষয়েও হাইকমিশনারকে অবহিত করেন। কোনো কর্মী কর্মস্থল থেকে নিখোঁজ হলে অথবা নিয়োগের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা না হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জরিমানাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে।
এ ছাড়া আটক ব্যক্তিদের দ্রুততম সময়ে নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের সুবিধার্থে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদানের বিষয়েও মন্ত্রী অবহিত করেন।
প্রবাসীদের কল্যাণ, বেতন ও রেমিট্যান্স সুবিধা
সাক্ষাৎকালে হাইকমিশনার প্রবাসী বাংলাদেশিদের দৈনন্দিন জীবন, আর্থিক নিরাপত্তা ও পারিবারিক দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন।
তিনি উল্লেখ করেন, অধিকাংশ বাংলাদেশি কর্মী পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করতে এবং দেশে থাকা স্বজনদের সহায়তা করতে মালদ্বীপে কর্মরত রয়েছেন। তাই তাদের উপার্জিত অর্থ নিরাপদে ও সহজে দেশে পাঠানোর সুযোগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ প্রসঙ্গে তিনি বৈধ ও অনুমোদিত আর্থিক চ্যানেলের মাধ্যমে দ্রুত, সহজ ও সাশ্রয়ী রেমিট্যান্স স্থানান্তরের সুযোগ সম্প্রসারণের বিষয়ে মন্ত্রীর সহযোগিতা কামনা করেন। প্রবাসী কর্মীদের জন্য সহজলভ্য ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা হয়।
হাইকমিশনার আরও অনুরোধ জানান, যাতে বাংলাদেশি কর্মীরা তাদের নিয়োগচুক্তিতে উল্লেখিত বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার ও নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী বেতন-ভাতা গ্রহণের সুযোগ পান। পাশাপাশি প্রবাসীদের ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং বেতনের একটি নির্দিষ্ট অংশ বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বাংলাদেশে পাঠানোর উপযুক্ত ব্যবস্থা বিবেচনার বিষয়টিও আলোচনায় স্থান পায়।
এসব বিষয়কে প্রবাসীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি, উপার্জিত অর্থের সুরক্ষা এবং তাদের পরিবারের কাছে নিয়মিত অর্থ পাঠানোর সুযোগ সহজ করার বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে আলোচনা করা হয়।
প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ও যৌথ সচেতনতামূলক কার্যক্রম
বৈঠকে বাংলাদেশ হাইকমিশন ও মালদ্বীপের স্বরাষ্ট্র, শ্রম ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদারের বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত হন।
মন্ত্রী জানান, প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিভিন্ন বিষয় দ্রুত চিহ্নিত ও সমাধানের লক্ষ্যে মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ হাইকমিশনের মধ্যে একটি সমন্বয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হবে। পাশাপাশি অনথিভুক্ত প্রবাসীদের বিষয়ে দ্বীপভিত্তিক তথ্য বিনিময়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের চিহ্নিত করা, প্রয়োজনীয় তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং যথাযথ সহায়তা প্রদানের সুযোগ আরও সহজ হবে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ হাইকমিশন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য যৌথ সচেতনতামূলক কর্মসূচি আয়োজনের বিষয়েও আলোচনা হয়।
এসব কর্মসূচিতে বায়োমেট্রিক নিবন্ধন, নিয়মিতকরণ প্রক্রিয়া, কর্মসংস্থানসংক্রান্ত অধিকার ও দায়িত্ব, সরকারি সেবা গ্রহণের পদ্ধতি এবং অননুমোদিত দালাল ও মধ্যস্থতাকারীদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য তুলে ধরার সুযোগ থাকবে।
হাইকমিশনার প্রস্তাবিত সমন্বয় ব্যবস্থাকে স্বাগত জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে মালদ্বীপের বিভিন্ন দ্বীপে বসবাসরত বাংলাদেশি কর্মীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান এবং তাঁদের কল্যাণসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো আরও কার্যকরভাবে সমন্বয় করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ-মালদ্বীপ সহযোগিতার নতুন মাত্রা
সাক্ষাৎটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের কল্যাণ, বৈধ কর্মসংস্থান, নিয়মিতকরণ ও বৈধকরণের এবং কর্মীদের সুরক্ষায় বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের মধ্যে বিদ্যমান সহযোগিতা আরও জোরদারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আলোচনায় মালদ্বীপ সরকারের নিবন্ধন ও কর্মসংস্থান কাঠামোর আওতায় প্রবাসীদের জন্য বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে অবহিতকরণ এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ হাইকমিশন প্রবাসী বাংলাদেশিদের কল্যাণে মালদ্বীপের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক নিরাপত্তা, নিয়মিতকরণ এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষাসংক্রান্ত বিষয়ে প্রবাসীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানে হাইকমিশন তার কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে।
সাক্ষাৎটি অত্যন্ত আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়। উভয় পক্ষ প্রবাসী বাংলাদেশিদের কল্যাণ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিয়মিত যোগাযোগ, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় আরও জোরদার করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।


