দেশভাগের ক্ষত আর মানুষের গল্পে অমর ঋত্বিক ঘটক

দেশভাগের ক্ষত আর মানুষের গল্পে অমর ঋত্বিক ঘটক
ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

দেশভাগ, উদ্বাস্তু জীবনের যন্ত্রণা, পরিচয়ের সংকট আর মানুষের অস্তিত্বের লড়াই, চলচ্চিত্রে এসব বিষয়কে যে কজন নির্মাতা অসামান্য আবেগ ও নিজস্ব ভাষায় তুলে ধরেছেন, তাদের অন্যতম ঋত্বিক কুমার ঘটক। ৪ নভেম্বর তার ১০১তম জন্মবার্ষিকী।

১৯২৫ সালের এই দিনে বাংলাদেশের রাজশাহীতে জন্মগ্রহণ করেন চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার ও অভিনেতা ঋত্বিক ঘটক। ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী এই নির্মাতাকে স্মরণ করতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন আয়োজন করেছে নানা অনুষ্ঠান।

ঋত্বিকের জীবন ও চলচ্চিত্রের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল ১৯৪৭ সালের দেশভাগ। দেশভাগের পর তার পরিবার কলকাতায় চলে যায়। নিজের জীবনের এই অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তার চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। উদ্বাস্তু মানুষের জীবন, শিকড় হারানোর বেদনা এবং সামাজিক বিপর্যয়ের অভিঘাত বারবার ফিরে এসেছে তার নির্মাণে।

বহরমপুরের কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে ১৯৫৮ সালে স্নাতক সম্পন্ন করেন ঋত্বিক। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হলেও পড়াশোনা শেষ করেননি। লেখালেখিকেই জীবনের অধিক অর্থবহ পথ বলে মনে করেছিলেন তিনি।

নাটকের মধ্য দিয়েই তার সৃজনশীল জীবনের পরিচিতি বাড়তে শুরু করে। ‘নবান্ন’ নাটক তাকে আলোচনায় নিয়ে আসে। ১৯৫১ সালে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের (আইপিটিএ) সঙ্গে যুক্ত হয়ে সমাজসচেতন শিল্পচর্চায় নিজেকে আরও গভীরভাবে সম্পৃক্ত করেন। ১৯৫২ সালে নির্মাণ করেন তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘নাগরিক’। একই বছর মঞ্চস্থ করেন ‘দলিল’ নাটক। ১৯৫৩ সালে মুম্বাইয়ে আইপিটিএর প্রদর্শনীতে নাটকটি প্রথম পুরস্কার অর্জন করে। পরে ১৯৫৫ সালে ‘গ্রুপ থিয়েটার’ নামে একটি নাট্যদল গঠন করেন এবং মঞ্চস্থ করেন ‘সাঁকো’।

চলচ্চিত্রে ঋত্বিকের যাত্রা শুরু অভিনেতা ও সহকারী পরিচালক হিসেবে। নিমাই ঘোষের ‘ছিন্নমূল’ (১৯৫০) ছবিতে যুক্ত ছিলেন তিনি। এরপর নিজের নির্মাণ ‘নাগরিক’ তার চলচ্চিত্রজীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়ে ওঠে। তথ্যচিত্রের বাস্তবতা, নাটকীয় অভিনয়, লোকজ ঐতিহ্য এবং নিরীক্ষাধর্মী নির্মাণশৈলীর সমন্বয়ে তৈরি হয়েছিল তার স্বতন্ত্র চলচ্চিত্রভাষা।

আরও পড়ুন

১৯৫৮ সালে মুক্তি পায় তার প্রথম বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র ‘অযান্ত্রিক’। সে সময়ের প্রচলিত চলচ্চিত্র ভাবনার বাইরে গিয়ে একটি গাড়িকে ছবির অন্যতম প্রধান চরিত্র হিসেবে তুলে ধরেছিলেন তিনি। যন্ত্রটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে জীবন্ত করে তোলার এই অভিনব প্রয়াস ছবিটিকে বিশেষ মর্যাদা দেয়।

চিত্রনাট্যকার হিসেবেও সাফল্য পেয়েছিলেন ঋত্বিক। বিমল রায়ের হিন্দি চলচ্চিত্র ‘মধুমতী’র চিত্রনাট্য লিখে অর্জন করেন ফিল্মফেয়ার পুরস্কার। পুনর্জন্মের ধারণাকে কেন্দ্র করে নির্মিত ছবিটি সে সময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।

নিজের চলচ্চিত্রজীবনে আটটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন ঋত্বিক। এর মধ্যে ‘মেঘে ঢাকা তারা’ তাঁর অন্যতম আলোচিত সৃষ্টি। দেশভাগের পর একটি উদ্বাস্তু পরিবারের টিকে থাকার সংগ্রাম এবং পরিবারের বড় মেয়ে নীতার আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ছবিটিতে উঠে এসেছে উদ্বাস্তু জীবনের নির্মম বাস্তবতা।

‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ ছবিতে এক পালিয়ে যাওয়া শিশুর চোখে কলকাতা শহরকে দেখিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে ‘কোমল গান্ধার’ চলচ্চিত্রে প্রতিফলিত হয়েছে তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক অবস্থান ও শিল্পদর্শন।

অদ্বৈত মল্লবর্মণের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ঋত্বিকের আরেক অনন্য সৃষ্টি। নদীকেন্দ্রিক মালো সম্প্রদায়ের জীবন, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের সংকট নিয়ে নির্মিত ছবিটি পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের সেরা ১০ চলচ্চিত্রের তালিকায় স্থান পায়।

তার শেষ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আত্মজৈবনিক নির্মাণ ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’। ১৯৭৪ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটিতে নিজের জীবন, সময় ও রাজনৈতিক ভাবনার নানা প্রতিফলন রয়েছে। পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পাশাপাশি ‘আদিবাসী’, ‘সিজার্স’, ‘ফিয়ার’, ‘রঁদেভু সিভিল ডিফেন্স’, ‘সায়েন্টিস্ট অব টুমরো’, ‘আমার লেনিন’ ও ‘পুরুলিয়ার ছৌ’সহ বেশ কয়েকটি প্রামাণ্যচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন তিনি।

১৯৭৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন ঋত্বিক ঘটক। মৃত্যুর পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তার চলচ্চিত্রের আবেদন ফুরায়নি। দেশভাগের ক্ষত, সামাজিক বৈষম্য, মানুষের লড়াই ও সম্পর্কের জটিলতা তুলে ধরার অসামান্য নির্মাণভঙ্গি আজও তাঁকে বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা হিসেবে বাঁচিয়ে রেখেছে।

 

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad