প্রথমবারের মতো প্রধান বিরোধী দল জামায়াত, দলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

প্রথমবারের মতো প্রধান বিরোধী দল জামায়াত, দলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
Advertisement
Advertisement

স্বাধীনতার পর তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক রাজনৈতিক বাস্তবতায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী ঐক্য মোট ৭৭ আসনে জয় পেয়েছে।

যদিও নির্বাচনের আগে দলটির নেতৃত্ব আরও ভালো ফলাফলের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ছিল।

ভোটের দিন বিচ্ছিন্ন কিছু অভিযোগ থাকলেও দলটির শীর্ষ নেতারা সামগ্রিকভাবে নির্বাচনকে সুষ্ঠু বলে মন্তব্য করেছিলেন। তবে কিছু কেন্দ্রের ফলাফলে গরমিলের অভিযোগ তুলেছেন জোটের নেতারা।

তাদের দাবি, বেশ কয়েকটি আসনে কারচুপি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের স্থানীয় কিছু কর্মকর্তার একপেশে ভূমিকা এবং ভোট গণনায় অনিয়মের অভিযোগও তুলেছেন তারা।

দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা অবশ্য সরাসরি ফলাফল নিয়ে কঠোর মন্তব্য করেননি। দলীয় সক্ষমতা ও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল পেরেই বেশ সন্তুষ্ট তারা।

শুক্রবার রাতে ১১ দলীয় জোটের বৈঠক শেষে জামায়াত আমির শফিকুর রহমান সাংবাদিক বলেছেন, নির্বাচনে ভোটগ্রহণ নিয়ে তাদের কোনো অভিযোগ নেই। তবে, বেশ কয়েকটি জায়গায় ফলাফল ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। এটি মেনে নেওয়া যায় না। এসব জায়গায় গেজেট প্রকাশের আগে সমস্যার সমাধানের তাগিদ দেন তিনি।

প্রতিকার না পেলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ারও হুঁশিয়ারি জানান তিনি।

জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা বসে থাকব না।’

এসময় দেশের বিভিন্ন জায়গায় দলের নেতাকর্মীদের উপর হামলার নিন্দা জানান তিনি।

জামায়াতের হাই কমান্ড যখন সংসদে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা পেয়ে খুশি, তখন তৃণমূলের কর্মীদের চোখেমুখে হতাশার ঝলক। অনেক কর্মী মনে করছেন, ভোটকেন্দ্র রক্ষায় ব্যর্থতাসহ দলের সাংগঠনিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন তারা।

দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ভোট গ্রহণে ছোটখাটো অভিযোগ থাকলেও অনেকাংশেই নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। তবে কয়েকটি আসনে ফলাফল কারচুপির প্রমাণ তাদের কাছে রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

পাশাপাশি দলকে ঘিরে কিছু গণমাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হয়েছে বলেও অভিযোগ তার।

আরও পড়ুন

নির্বাচনের আগে দলের আমির শফিকুর রহমান-এর এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়া, কর্মজীবী নারীদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য ছড়িয়ে পড়া এবং বরগুনা শাখার এক নেতার বিতর্কিত মন্তব্য ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক অঙ্গন সংশ্লিষ্টরা।

এছাড়া ঢাকা-১৭ আসনে দলীয় প্রার্থী খালিদুজ্জামানের সঙ্গে চেকপোস্টে সেনা সদস্যের বাকবিতণ্ডাও দলটিকে সমালোচনার মুখে ফেলে।

ঐতিহাসিকভাবে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকার বিতর্কও দলটির জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে ছিল। তারপরও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দলটির এবারের ফলাফল খারাপ বলা যাবে না। কারণ, জোট ৭৭ আসনে জয় ছাড়াও প্রায় ১০০ আসনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে।

খুলনা, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগে দলটি তুলনামূলক ভালো ফলাফল করেছে।

২০২৪ সালের জুলাই গণআন্দোলনের পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মাঠ পর্যায়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে সক্ষম হয়েছে জামায়াত, যা নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে।

গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে অতীতে প্রায় ১২ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৮ আসনে জয়ের অভিজ্ঞতা থাকলেও এবার দলটি তুলনামূলক বড় সাফল্য দেখিয়েছে।

যশোর-৪ আসনে নব নির্বাচিত সংসদ সদস্য জেলা জামায়াতের আমির গোলাম রসুল বলেছেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে আমাদের সীমাবদ্ধাত ছিল। আমরা অনেক জায়গায় শেষ পর্যন্ত ভোটকেন্দ্র রক্ষা করতে পারেনি। স্থানীয় কর্মকর্তারা কারচুপি করে জিতিয়েছেন।’

নির্বাচনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের চিত্র

এবার জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে জামায়াত নিজেই ২১৬ আসনে ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকে নির্বাচন করে। এছাড়া জোটের শরিক দলগুলো বিভিন্ন প্রতীকে নির্বাচন করে। মোট ১১টি দলের সঙ্গে জোট হলেও বাস্তবে ৯টি দলের প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নেয়।

জোটের মধ্যে জামায়াত এককভাবে ৬৮টি আসন পায়। অন্যদিকে শরিকদের মধ্যে কয়েকটি দল বাকি আসনগুলোয় জয় পায়।

বিশ্লেষকদের মতে, সারাদেশে প্রায় ৭৫ আসনে প্রায় ৯০ জন বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ভোট বিভক্ত হয়, যা কিছু ক্ষেত্রে জামায়াতের জন্য সুবিধা তৈরি করে।

জুলাই আন্দোলনের পর সাংগঠনিক বিস্তার

জুলাই আন্দোলনের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে মাঠে বেশি সক্রিয় হয় জামায়াত। প্রায় সব আসনে প্রাথমিক মনোনয়ন দিয়ে সাংগঠনিক প্রস্তুতি জোরদার করে দলটি।

অমুসলিম শাখা চালু, নারী ও তরুণদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং সামাজিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন ভোটারগোষ্ঠী তৈরির চেষ্টা করে দলটি। এর ধারাবাহিকতায় বড় কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে দলটির ছাত্র সংগঠন ভালো ফল করায় দলীয় আত্মবিশ্বাস আরও বাড়ে।

অতীত নির্বাচনী ফলাফল

জামায়াতের নির্বাচনী ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায়—১৯৯১ সালে ১২ দশমিক ১৩ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৮ আসনে জয় পেয়েছিল। ১৯৯৬ সালে প্রায় ৮ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট পেয়ে পায় তিন আসন।

২০০১ সালে (জোটগত নির্বাচন) ৪ দশমিক ২৮ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৭ আসন পায়। ২০০৮ সালে ৪ দশমিক ৭৯ শতাংশ ভোট পেয়ে মাত্র দুটি আসন পায় দলটি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad