নানা শঙ্কা ও অভিযোগের মধ্যেই শুরু হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাঠের লড়াই। নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রায় দুই হাজার প্রার্থীকে বুধবার প্রতীক বরাদ্দ দেওয়ার মধ্য দিয়ে বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে নির্বাচনী প্রচার।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা পর্যন্ত চলবে এই প্রচারপর্ব। এ সময় প্রার্থীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট চাইবেন। দেশজুড়ে নির্বাচনী সভা-সমাবেশ, মিছিল ও প্রচারণায় সরগরম হয়ে উঠবে দেশ। তবে প্রচারের প্রতিটি ধাপে নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত আচরণবিধি মেনে চলতে হবে প্রার্থী ও দলগুলোকে।
এদিকে, ভোটের প্রচারণা শুরু হলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত না হওয়ায় উদ্বেগ জানিয়ে আসছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। দলগুলোর অভিযোগ, কয়েকটি নির্দিষ্ট দলের প্রার্থীরা আচরণবিধি ভঙ্গ করলেও মাঠ প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছে না। পক্ষান্তরে, কোনো অপরাধ না করেও তাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি, চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের জামিনে মুক্তি দিয়ে মাঠে সক্রিয় করার অভিযোগও রয়েছে। প্রার্থী ও সমর্থকদেরকে হামলা, হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছে তারা।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামি, জাতীয় পার্টি (জাপা), জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে ২৯৮টি সংসদীয় আসনে মোট প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ১ হাজার ৯৭২ জন। সীমানা জটিলতার কারণে পিছিয়ে থাকা পাবনার দুটি আসনে এখনো প্রার্থী চূড়ান্তের প্রক্রিয়া চলছে। পাবনা-১ আসনে সাতটি এবং পাবনা-২ আসনে পাঁচটি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে।
প্রচারে মানতে হবে যেসব বিধি
প্রচারের সময় কী করা যাবে, আর কী করা যাবে না-সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে নির্বাচনী আচরণবিধিতে। প্রথমবারের মতো পোস্টার ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অপচনশীল দ্রব্য দিয়ে ব্যানার, লিফলেট ও ফেস্টুন তৈরি করা যাবে না। পলিথিন বা প্লাস্টিক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। লিফলেট, হ্যান্ডবিল, ফেস্টুন ও ব্যানারে নিজের প্রতীক ও ছবি ছাড়া অন্য কারও ছবি ব্যবহার করা যাবে না। তবে কোনো প্রার্থী নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল থেকে মনোনীত হলে তিনি তার বর্তমান দলীয় প্রধানের ছবি ব্যবহার করতে পারবেন, যা অবশ্যই পোর্ট্রেট আকারের হতে হবে।
এবার প্রথমবারের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে প্রার্থী বা তার নির্বাচনী এজেন্ট কিংবা প্রার্থীর পক্ষে অন্য কেউ প্রচার চালাতে পারবেন। তবে শর্ত হলো প্রচারণা শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নাম, অ্যাকাউন্ট আইডি, ই-মেইলসহ সনাক্তকরণ তথ্য রিটার্নিং অফিসারের কাছে জমা দিতে হবে। অসৎ উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করা যাবে না।
নির্বাচনী স্বার্থে ধর্মীয় বা জাতিগত অনুভূতির অপব্যবহার করা যাবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনসংক্রান্ত যেকোনো কনটেন্ট প্রকাশ বা শেয়ারের আগে তার সত্যতা যাচাই করতে হবে। ভোটারদের বিভ্রান্ত করা, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কোনো প্রার্থী বা ব্যক্তির চরিত্রহনন বা সুনাম ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, পক্ষপাতমূলক, বিদ্বেষপূর্ণ, অশ্লীল বা মানহানিকর তথ্য তৈরি, প্রকাশ বা প্রচার করা নিষিদ্ধ। এ ছাড়া, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিদেশে জনসভা বা প্রচারণা; সংসদীয় আসনে ২০টির বেশি বিলবোর্ড ব্যবহার; নির্বাচনের দিন ও প্রচারকালীন সময়ে ড্রোন ব্যবহার করা যাবে না। অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা কোনো প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না।
লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে অভিযোগ
এদিকে, এখনো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, লেভেল প্লেয়ি ফিল্ড না থাকা নিয়ে অভিযোগ জানিয়েছে আসছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। যার মধ্যে রয়েছে বিএনপি, জামায়াত, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, এনসিপি ও জাতীয় পার্টিও।
বুধবার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা ইউসুফ আশরাফ বলেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না থাকার অভিযোগ দিয়েছি। কিছু দলের প্রার্থীরা আচরণবিধি ভঙ্গ করলেও ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। এ থেকে বোঝা যায় নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। এ ছাড়া, দলটির অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির কারণে সুষ্ঠু নির্বাচন হুমকির মুখে। চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের জামিনে মুক্তি দিয়ে মাঠে সক্রিয় করা হচ্ছে। দলটির প্রার্থী ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে হামলা, হুমকি এবং সন্ত্রাসী তৎপরতা চলছে।
একই দিনে ঢাকা-১৫ আসনে আমিরে জামায়াত শফিকুর রহমানের পক্ষে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক গ্রহণ করে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আহসানুল মাহবুব জুবায়ের অভিযোগ করেন, সন্ত্রাসীরা আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা এখনো পক্ষপাতমূলক আচরণ হচ্ছে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হয়নি, তারা বিশেষ একটি দলের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। ইসির কাছে অভিযোগ জানানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
লেভেল প্লেয়ি ফিল্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিএনপিও। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম গত রোববার সিইসির সঙ্গে স্বাক্ষাৎ শেষে বলেন, ‘বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় রিটার্নিং অফিসার, পুলিশ সুপার, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা একটি দলের পক্ষে ন্যক্কারজনকভাবে কাজ করছে বলে আমরা অভিযোগ পেয়েছি। ইসির কয়েকজন কর্মকর্তাও একটি দলের পক্ষে কাজ করছেন বলেও অভিযোগ পেয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘জামায়াতের কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে এনআইডির কপি, বিকাশ নম্বর, মুঠোফোন নম্বর সংগ্রহ করছে, যা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ভঙ্গ, ক্রিমিনাল অফেন্স, এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে ইসিকে আহ্বান জানিয়েছি।’
প্রার্থিতা প্রত্যাহার ৩০৫ জনের, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ১৯৭২
এদিকে, নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ৩০৫ জন প্রার্থিতা প্রত্যাহার করায় ২৯৮ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী দাঁড়িয়েছে ১৯৭২ জন। এবার নির্ধারিত সময়ে ৩০০ সংসদীয় আসনে ২ হাজার ৫৮০ মনোনয়নপত্র জমা পড়ে। ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি বাছাইয়ে ৭২৫ জনের মনোনয়নপত্র বাতিলের পর বৈধ প্রার্থী ছিলেন ১ হাজার ৮৫৫ জন। রিটার্নিং অফিসারদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ৬৪৫ জন আপিল করেন। আপিল শুনানি শেষে প্রার্থিতা ফিরে পান ৪৩১ জন; সোমবার পর্যন্ত মোট বৈধ প্রার্থী দাঁড়ায় ২ হাজার ২৯৪ জন। তবে, সীমানা জটিলতার কারণে পিছিয়ে থাকা পাবনার দুটি আসনে এখনো প্রার্থী চূড়ান্তের প্রক্রিয়া চলছে। পাবনা-১ আসনে সাতটি এবং পাবনা-২ আসনে পাঁচটি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। এ দুই আসনে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২৬ জানুয়ারি, আর প্রতীক বরাদ্দ হবে ২৭ জানুয়ারি। ভোট হবে ১২ই ফেব্রুয়ারি।
সামনের দিনগুলো চ্যালেঞ্জিং
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলীম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, লেভেল প্লেয়ি ফিল্ড না থাকা, প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে দলগুলোর অভিযোগ সামনের দিনগুলোতে আরও বাড়তে থাকবে।
তিনি বলেন, আচরণবিধি ভঙ্গ করলেই আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে, মাঠটাকে সমান রাখা দরকার। শক্ত ভূমিকা নেওয়ার পাশপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেন অন্য দিকে না যায় নজর রাখতে হবে। ইসিকে আইনশৃঙ্খলা তদারকি ও পর্যালোচনা করতে হবে, যাতে শান্তিপূর্ণ থাকে। প্রচারের সময় সহিংসতা ঘটতে পারে, সেই দিকে নজর রাখতে হবে। একটা ছোট ঘটনা ঘটলে যারা নির্বাচনকে ভন্ডুল করতে চায়, তারা ঢুকে পরিস্থিতি খারাপ করতে পারে। এসবই চ্যালেঞ্জ, ইসি চাইলে নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব।
শুরু হলো পোস্টাল ব্যালটে ভোটদান
প্রার্থীকে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোটদান। ২৫ জানুয়ারির মধ্যে ভোট দিয়ে মধ্যে প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালট পোস্ট অফিসে দিতে হবে। এবার, ভোট দিতে নিবন্ধন করেছে ৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৪২ জন প্রবাসী। এ বিষয়ে বুধবার ইসি এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়েছে, আগামী ২৫ জানুয়ারির মধ্যে পোস্টাল ব্যালট পোস্ট করা না হলে নির্ধারিত সময়ে রিটার্নিং অফিসারের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি হবে। এজন্য প্রবাসী ভোটারদের আগামী ২৫ জানুয়ারির মধ্যে পোস্টাল ব্যালটে ভোটদান কার্যক্রম সম্পন্ন করে নিকটস্থ পোস্ট অফিসে পাঠাতে হবে।


