সীমান্তে ২৮ জন মানুষ, তাদের মধ্যে ১০ জন নারী ও ছয় শিশু। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তরেখায় অনিশ্চিত ৩০ ঘণ্টা পেরিয়ে আপাতত তাদের ঠাঁই ভারতের ভেতরে। কিন্তু হঠাৎ করেই নাগরিক পরিচয় নিয়ে শুরু হওয়া প্রশ্নে তাদের জীবনে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা কি কাটল এতটুকু?
ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) তাদের বাংলাদেশি দাবি করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিবি) কঠোর অবস্থানের কারণে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। দুই দেশের মধ্যে এই টানাটানিতে নির্ঘুম রাত আর তীব্র রোদের মধ্যে অবর্ণনীয় দুর্দশায় কেটেছে ভুক্তভোগীদের দিন।
বৃহস্পতিবার ভোর ৩টার দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বাঙ্গাবাড়ি সীমান্ত দিয়ে ওই ২৮ জনকে পুশইন করার চেষ্টা করে ১২ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের আশরাফপুর ক্যাম্পের সদস্যরা।
গোমস্তাপুর উপজেলার এই বাঙ্গাবাড়ি ঘুঘিয়া আনারপুর দুর্গম সীমান্তগুলোর একটি। আন্তর্জাতিক শূন্যরেখার এই এলাকা মূলত বিস্তীর্ণ খাল। তবে পানি না থাকায় সেটি গহীন জঙ্গলে রূপ নিয়েছে। সেই জঙ্গলাকীর্ণ শূন্যরেখা দিয়ে পুশইনের শিকার হন অসহায় ওই মানুষগুলো।
সেখানে জোঁক, সাপের আক্রমণের শঙ্কাও ছিল। এর মধ্যে দুপুরে শুরু হয় বজ্রসহ বৃষ্টি আর ঝড়। রাতেও হয় বৃষ্টি আর মুহুর্মুহু বজ্রপাত। ভয়ার্ত শিশু এবং নারীদের করুণ আর্তনাদ সেখানে উপস্থিত সংবাদকর্মী ও বিজিবি সদস্যদের আবেগ স্পর্শ করে। মানুষগুলো আন্তর্জাতিক সীমান্ত পিলার ‘২০৩/৬-আর’ এর শূন্যরেখায় অবস্থান করছিল। এমন পরিস্থিতিতে শিশুদের কান্নার শব্দ ভেসে আসছিল।

দুপুরের দিকে বিএসএফের এক সদস্যকে তাদের দুপুরের খাবার দিয়ে যেতে দেখা গেছে। বিজিবির অনড় মনোভাব দেখে অবশেষে শুক্রবার সকালে তাদের ভারতীয় সীমানার ৫০ গজ ভেতরে নিয়ে রাখা হয়। তবে সেখানে তাদের খোলা আকাশের নিচেই রাখার তথ্য মিলেছে।
সীমান্তর্বর্তী জনপদটির বাসিন্দা প্রবীণ তৈমুর শেখ টাইমসকে বলেন, ‘আমার জীবদ্দশায় কখনো এমন অমানবিক কাজ দেখিনি।’
স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী আব্দুল্লাহ আল মামুন নাহিদ বলেন, ‘এটি মানবতাবিরোধী কাজ। ভারত তাদের দেশের মানুষকে জীবননাশের হুমকি এবং গৃহহীন করে এই অঞ্চলে হিংসা ছড়ানোর মধ্যে দিয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে।’
পুশইনের এই সংকট শুরু হয় অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই। বাংলাভাষী শত শত মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়। আর মে মাসের শুরুতে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বিজেপির নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই চাপ আরও বাড়ে।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হয়েই শুভেন্দু অধিকারী নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ) কার্যকরের ঘোষণা দেন। কাউকে বাংলাদেশি ‘অনুপ্রবেশকারী’ সন্দেহ হলেই সরাসরি সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
এরপর সন্দেহভাজনদের ‘অনিবন্ধিত’ আখ্যা দিয়ে আটক করে সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় স্থাপিত অস্থায়ী ‘হোল্ডিং সেন্টারে’ রাখা হচ্ছে। পরে তাদের বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
গত ২৯ মে খবর আসে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গজুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নথিপত্র না থাকা অন্তত ৩৮৬ জনকে আটক করে আটটি সীমান্ত জেলার ১৩টি ‘হোল্ডিং সেন্টারে’ পাঠানো হয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে দাবি করা হয়, বেশ কিছু মানুষ স্বেচ্ছায় বাংলাদেশ সীমান্তগুলোতে জড়ো হচ্ছেন।
গত ২৬ মে থেকে টানা কয়েকদিন ভারতের হাকিমপুর থেকে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার কেড়াগাছি ও চন্দনপুর সীমান্তে দিয়ে পুশইনের চেষ্টার কথা সামনে আসে।
প্রতিরোধের মুখে হাকিমপুরের ‘হোল্ডিং সেন্টার’ থেকে বাংলাভাষীদের অন্য সীমান্তে সরিয়ে নেওয়ার কথা জানান বিজিবির কর্মকর্তারা।
এর মধ্যে বৃহস্পতিবার অন্তত ১০টি সীমান্ত দিয়ে পুশইনের চেষ্টা ঠেকিয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছে বিজিবি। শুক্রবারও অন্তত চারটি সীমান্ত দিয়ে এই চেষ্টা হয়েছে বলে জানিয়েছেন টাইমসের প্রতিবেদকরা।
বাঙ্গাবাড়ি সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বে থাকা ১৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফুল ইসলাম মাসুম জানান, বিএসএফের সঙ্গে পতাকা বৈঠকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, কোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ বা পুশইন বাংলাদেশের জন্য গ্রহণযোগ্য হবে না।
বিজিবির রাজশাহী সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক এবং দুঃখজনক। সীমান্তের জন্য আন্তর্জাতিক আইন রয়েছে। অথচ বিএসএফ তা অনুসরণ না করে অবৈধভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পুশইন করেছে।’
আরও চার সীমান্তে একই চেষ্টা
শুক্রবার ভোরে চার সীমান্ত দিয়ে আরও ৭৫ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হয়। এর মধ্যে নওগাঁর সাপাহার সীমান্ত দিয়ে নারী, পুরুষ এবং শিশুসহ ১৭ জনকে পুশইনের চেষ্টা ব্যর্থ করে দেওয়ার কথা জানিয়েছে বিজিবি।
শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে হাঁপানিয়া সীমান্ত এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
বিজিবি জানায়, সীমান্তের ২৩৮/এমপি সীমান্ত পিলার দিয়ে বিএসএফ পান্নাছাড়া ক্যাম্পের সদস্যরা ১৭ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে বিজিবি বাধা দেওয়ার পর তারা শূন্যরেখায় অবস্থান করেন।

১৬ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম বলেন, ‘অবৈধভাবে বাংলাদেশে কাউকে অনুপ্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। তাদের ভারতীয় ভূখণ্ডে পাঠানোর (পুশ-ব্যাক) কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’
এ ছাড়া লালমনিরহাটের পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা এবং আদিতমারী সীমান্ত দিয়ে শুক্রবার ভোরে ৩৩ জনকে পুশইনের চেষ্টা করা হয়। এর মধ্যে পাটগ্রামের শ্রীরামপুর সীমান্তের পয়ষট্টিবাড়ী এলাকা দিয়ে ১০ জন, হাতীবান্ধার ফকিরপাড়া সীমান্ত দিয়ে ১১ জন এবং আদিতমারীর দীঘলটারি সীমান্তের ৯২৫ নম্বর মেইন পিলারের দুটি এলাকা দিয়ে ১২ জনকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চলে।
বিজিবির টহল দল ও স্থানীয় জনগণ তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুললে বিএসএফ পিছু হটতে বাধ্য হয়। বর্তমানে ওই ব্যক্তিরা শূন্যরেখা থেকে ৫০ গজ ভেতরে ভারতে অবস্থান করছেন। পুশইনের শিকার হওয়া ১০ জন একই পরিবারের সদস্য বলেও তথ্য মিলেছে।
পয়ষট্টিবাড়ী বিওপি ক্যাম্পের কমান্ডার নায়েব সুবেদার মিজানুর রহমান বলেন, ‘সীমান্তে আমাদের টহল দল প্রস্তুত থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে তা প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে।’
দূর্গাপুর সীমান্তের বাসিন্দা ও ইউপি সদস্য আব্দুর রাজ্জাক জানান, সকালে ১২ জনকে বাংলাদেশের সীমানায় নিয়ে আসে বিএসএফ। স্থানীয় বাসিন্দারা দেখতে পেয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করে। পরে বিজিবি পুশইন রুখে দেয়।
এদিকে, ভোরে পঞ্চগড় সদর উপজেলার বড়বাড়ি–প্রধানপাড়া গ্রামের সীমান্ত দিয়ে নারী–শিশুসহ ১০ জনকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হয়।
বিএসএফ তাদের সীমান্তের কাঁটাতারের গেট খুলে দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়। তবে বিজিবির টহলদলের বাধায় বিএসএফ সদস্যরা ওই ব্যক্তিদের নিয়ে ভারতের ভেতরে চলে যায়। পরে ওই ১০ জন ব্যক্তি সীমান্তের ভারতীয় অংশে শূন্যরেখা থেকে প্রায় ২০ গজ দূরে অবস্থান করতে থাকেন।
সেই সীমান্তে দায়িত্ব পালন করা নীলফামারী ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘অনুপ্রবেশ ও পুশইন রোধে সীমান্তে টহল জোরদার রয়েছে।’
পাশাপাশি কুষ্টিয়া ও মেহেরপুর সীমান্ত দিয়েও ১৫ জনের মতো মানুষকে পুশইন করার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার তথ্য মিলেছে।
৪৭ বিজিবি কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তের প্রায় ৪৬ কিলোমিটার এবং মেহেরপুরের গাংনী সীমান্তের ৩৬ কিলোমিটার এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করেছে। বর্ডার পোস্ট-বিওপিতে অতিরিক্ত জনবলও মোতায়েন করা হয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারাও বিজিবিকে সহযোগিতা করছেন।
দৌলতপুর সীমান্তের চিলমারী চল্লিশপাড়া এলাকার বাসিন্দা জাহিরুল ইসলাম বলেন, ‘ভারত থেকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের যে চেষ্টা চলছে, তা আমরা মেনে নেব না।’
৪৭ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি বলেন, ‘সীমান্তে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে, প্রয়োজনে আরও জনবল বাড়ানো হবে। সীমান্ত রক্ষার প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না।’
প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়েছেন নওগাঁর রিফাত হোসেন সবুজ, লালমনিরহাটের জামাল বাদশা, পঞ্চগড়ের রনি মিয়াজী ও কুষ্টিয়ার আল মামুন সাগর


