আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য ১১টি সংস্কার কমিশন করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। অথচ পাঁচটি কমিশনের সুপারিশ নিয়ে সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কোনো আলোচনাই করেনি। ফলে অনিশ্চিত হয়ে আছে এসব কমিশনের সুপারিশ।
এই কমিশনগুলো হচ্ছে শ্রম, নারী, গণমাধ্যম, স্বাস্থ্য এবং স্থানীয় সরকার সংস্কার বিষয়ক কমিশন। এর মধ্যে নিজেদের সুপারিশের ভাগ্য জানতে চেয়ে প্রধান উপদেষ্টার কাছে চিঠি লিখেছেন কমিশনগুলোর প্রধানরা। কিন্তু এখনো তারা সেই চিঠির কোনো জবাব পাননি।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে বিভিন্ন খাতের সমস্যা দূর করতে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। আর এই সংস্কারের সুপারিশ তৈরির জন্য প্রথম দফায় গঠন করে ছয়টি সংস্কার কমিশন। এগুলো ছিল সংবিধান, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচনব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, দুর্নীতি দমন ও পুলিশ সংস্কার কমিশন। দ্বিতীয় দফায় গঠন করা হয় শ্রম, নারী, গণমাধ্যম, স্বাস্থ্য এবং স্থানীয় সরকার সংস্কার বিষয়ক আরও পাঁচটি কমিশন।
সংস্কার কমিশনগুলোর সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতার জন্য পরে গঠন করা হয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। তবে এই জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের আলোচনায় দ্বিতীয় ধাপে গঠন করা পাঁচ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ স্থানই পায়নি। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে আলোচনা করে ৮৪টি বিষয়ে নিয়ে জুলাই সনদ স্বাক্ষর করে রাজনৈতিক দলগুলো। চাপা পড়ে যায় পাঁচ কমিশনের সুপারিশ।
এ নিয়ে শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, শ্রম সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক অঙ্গীকার দরকার। অথচ বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনাই হয়নি। ‘সরকার হয়তো সংবিধান সংস্কারকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে, তাই অন্য কয়েকটি কমিশনের সুপারিশকে গুরুত্ব দেয়নি’-বলেন সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এসব কমিশনের সুপারিশ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে জানিয়ে পরবর্তী সরকার এ ব্যাপারে উদ্যোগী হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশ আলোচনা না হওয়ায় মোটেও অবাক হননি এর প্রধান শিরিন পারভিন হক। তিনি বলেন, প্রধান উপদেষ্টার আশেপাশেই এমন সব মানুষ আছেন, যারা মনে করেন নারীদের বিষয় নিয়ে আলোচনার কিছু নেই। নারীবিষয়ক কমিশনের সুপারিশ কখনো বাস্তবায়ন হবে কি না তা নিয়েও কোনো ধারণা নেই বলে জানান শিরিন পারভিন হক।
কমিশনগুলোর প্রধানেরা বলেন, জুলাই সনদে গণমাধ্যম, নারী, শ্রম, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় সরকার বিষয়ক সংস্কারগুলো অন্তর্ভুক্ত না হলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দলগুলো সেগুলো বাতিল বা উপেক্ষা করতে পারে। এতে জনগণের মধ্যে ব্যাপক হতাশা ও ক্ষোভ সৃষ্টি হতে পারে। কারণ, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে অসংখ্য শ্রমিক, নারী ও সাংবাদিক প্রাণ দিয়েছেন। তাদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে যে আশা তৈরি হয়েছে, তা উপেক্ষা করা হলে সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ও দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশনের প্রধান ইফতেখারুজ্জামান জানান, জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনকে শুধু ছয়টি কমিশনের সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার ম্যানডেট দেওয়া হয়েছিল; বাকি পাঁচটির সঙ্গে নয়।
তিনি আরও বলেন, ‘এই কমিশনগুলোর সুপারিশ চাপা পড়ে আছে। সত্যিকার অর্থে এগুলোর কোনো অগ্রগতি হবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ আছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক হাসানুজ্জামান চৌধুরী বলেন, অর্ন্তবর্তী সরকারের সংস্কার আসলে আন্তরিকতাহীন। আসলে সত্যিকার অর্থে কোনো সংস্কারই হয়নি। আবার যেসব সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে সেগুলো আদৌ বাস্তবায়ন হবে কি না–তা নিয়ে সন্দেহ আছে।


