গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে প্রথমবারের মতো উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ হতে যাচ্ছে। আগামী রোববার তিন দিনের সরকারি সফরে মস্কো যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এ সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে কূটনৈতিক মহল। তারা বলছেন, বিশ্বের প্রধান প্রধান শক্তির সাথে সম্পর্ক জোরদার করে ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখার যে চেষ্টা ঢাকা করছে, এটি তারই একটি বড় অংশ। গত কয়েক মাসে নতুন সরকার ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক যোগাযোগ বেশ জোরদার করেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই মস্কো সফর সেই প্রচেষ্টাকে আরও এগিয়ে নেবে এবং সব প্রধান অংশীদারের সাথে একটি ইতিবাচক ও গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতিকে নতুন করে প্রমাণ করবে।
বর্তমান জটিল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে দেশের জাতীয় উন্নয়ন ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করার পাশাপাশি সব বড় শক্তির সাথে সমান তালে চলার যে লক্ষ্য ঢাকার রয়েছে, এই সফর মূলত সেটিই স্পষ্ট করছে।
সফরসূচি অনুযায়ী, আগামী সোমবার রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসবেন খলিলুর রহমান। এ ছাড়া তিনি রাশিয়ার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে দেখা করবেন এবং স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেবেন। বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পাশাপাশি সমসাময়িক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে। বিশেষ করে, খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নির্বাচিত সভাপতি হওয়ায় এই সফরের তাৎপর্য অনেক বেড়ে গেছে, যা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার সাথে দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতার একটি স্থায়ী কাঠামো তৈরির লক্ষ্যেই এই দূরদর্শী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রাশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. নজরুল ইসলাম এ সফরকে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেছেন।
‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে তিনি বলেন, “নতুন সরকার গঠনের পর এটিই হবে ঢাকা ও মস্কোর মধ্যে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক স্তরের প্রথম যোগাযোগ। আমরা এই বৈঠকগুলো থেকে ফলপ্রসূ আলোচনা এবং ইতিবাচক ফলাফল আশা করছি।”
বাংলাদেশ ও রাশিয়া দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে আসছে। দুই দেশের এই সহযোগিতা মূলত জ্বালানি, বাণিজ্য, কৃষি, শিক্ষা, মানবসম্পদ এবং প্রতিরক্ষা খাতে বিস্তৃত। বিশেষ করে, দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাথে সম্পৃক্ততার কারণে রাশিয়ার সাথে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সম্পর্ক সবচেয়ে মজবুত।
রাশিয়ার কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় বাস্তবায়িত রূপপুর প্রকল্পকে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার প্রধান প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রাষ্ট্রদূত নজরুল ইসলাম জানান, রাশিয়ার সার্বিক সহযোগিতায় এই প্রকল্পের কাজ অত্যন্ত চমৎকারভাবে এগিয়ে চলছে।
তিনি বলেন, “রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ পুরোদমে চলমান রয়েছে। এর সফল বাস্তবায়নের জন্য সব ধরনের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছে রাশিয়া। আশা করা হচ্ছে, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী এক বছরের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির দ্বিতীয় ইউনিটের আনুষ্ঠানিক উৎপাদন শুরু হবে।”
জ্বালানি খাতের বাইরেও রাশিয়ার সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বাড়াতে আগ্রহী ঢাকা। বিশেষ করে বাংলাদেশ সেখান থেকে খাদ্যশস্য, গম ও সার আমদানি বাড়াতে চায়, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং কৃষি উৎপাদনশীলতা ধরে রাখতে অত্যন্ত জরুরি।
রাষ্ট্রদূত বলেন, “দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের আরও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। রাশিয়া আমাদের খাদ্যশস্য ও সারের একটি বড় উৎস হতে পারে, যা বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।”
তিনি আরও বলেন, এই সফরের মাধ্যমে প্রযুক্তি, শিক্ষা, ওষুধ শিল্প, মানবসম্পদ এবং বিনিয়োগের মতো নতুন নতুন ক্ষেত্রে যৌথ সহযোগিতার পথ উন্মোচিত হবে। একই সাথে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুই দেশ নিজেদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মতামত বিনিময়ের সুযোগ পাবে।


