চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর আমন্ত্রণে মে মাসের প্রথম সপ্তাহে বেইজিং সফরে যাচ্ছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তার এই সফরের মূল লক্ষ্য দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার করা; চীনের সাথে বাংলাদেশের কৌশলগত যোগাযোগকে আরও শক্তিশালী করে তোলা।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সম্প্রতি নয়াদিল্লি সফর করেছেন। সেখানে তিনি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের সাথে বৈঠক করেন। ভারতের এই সফরের পরপরই তার চীন সফর বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। এই দুই সফর থেকে এটি স্পষ্ট যে, ঢাকা এই অঞ্চলের প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে একটি সতর্ক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, নতুন সরকার গঠনের পর এ ধরনের যোগাযোগ একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। মন্ত্রণালয়ের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, নীতিনির্ধারকদের জন্য বিভিন্ন দেশের রাজধানীতে যাওয়া এবং নিজেদের অগ্রাধিকার ব্যাখ্যা করা একটি স্বাভাবিক বিষয়। এটি সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো খুঁজে বের করতে সাহায্য করে। তিনি আরও যোগ করেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে বেইজিং একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে সবসময়ই কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে।
এই সফরের সময়টিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বাংলাদেশ ও চীন উভয় দেশেরই পঞ্চবার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা চলছে। দুই দেশের এই উন্নয়ন চক্র একই সময়ে হওয়ায় বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সমন্বিত অংশীদারিত্ব
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে একটি সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্ব বিদ্যমান। এই সম্পর্ক মূলত অর্থনৈতিক, অবকাঠামো এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। চীন বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং উন্নয়ন অর্থায়নের প্রধান উৎস।
২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট আমদানির এক-চতুর্থাংশের বেশি আসে চীন থেকে। এটি দুই দেশের অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার গভীরতা প্রকাশ করে। চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর আওতায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মহাসড়ক এবং পদ্মা সেতু রেল সংযোগের মতো বড় প্রকল্পগুলো বাংলাদেশের উন্নয়নে বেইজিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রমাণ দেয়।
প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহকারী দেশ চীন। যুদ্ধবিমান থেকে শুরু করে নৌবাহিনীর বিভিন্ন সরঞ্জাম সরবরাহে চীন শীর্ষে রয়েছে।
তবে এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ বাণিজ্যের বিশাল ভারসাম্যহীনতা। চীনের তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এই ব্যবধান কমাতে দুই দেশ এখন বিভিন্ন উপায় নিয়ে কাজ করছে। এর মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষর এবং ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃষি ও শিল্প স্থানান্তরের মতো খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা চলছে।
বিএনপি প্রতিনিধি দলের সফর
চীনের সাথে এই কূটনৈতিক তৎপরতা কেবল সরকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। রাজনৈতিক পর্যায়ে সম্প্রতি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে দলটির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল চীন সফর করেছে। সেখানে তারা চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সিনিয়র নেতাদের সাথে বৈঠক করেন।
জানা গেছে, দুই পক্ষই দলীয় সম্পর্ক জোরদার করার লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই করতে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, আরও আলোচনার পর এই সমঝোতা স্মারকের একটি খসড়া চূড়ান্ত করা হবে।
রাজনৈতিক অবস্থান
ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যে উষ্ণ রাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় রয়েছে। নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের সফরের মাধ্যমে এই সম্পর্ক আরও দৃঢ় হচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের শীর্ষ নেতাদের পূর্ববর্তী সফরগুলো দুই দেশের মধ্যে আস্থা ও পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরিতে সহায়ক হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বেইজিং সফরের কথা উল্লেখ করেন এই উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। সেই সফরে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে বৈঠক করেছিলেন মুহাম্মদ ইউনূস। এছাড়াও সাবেক পররাষ্ট্র কর্মকর্তাদের পূর্ববর্তী বিভিন্ন তৎপরতার কথাও তিনি স্মরণ করেন।
খলিলুর রহমান ও ওয়াং ই-এর আসন্ন বৈঠক এই সম্পর্ককে আরও সংহত করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই সফর ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে আরও উচ্চপর্যায়ের সফরের পথ প্রশস্ত করতে পারে।
বর্তমান জটিল ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বেইজিং সফর বাংলাদেশের যোগাযোগ, সংলাপ এবং ভারসাম্যের একটি বৃহত্তর কৌশলের প্রতিফলন। বাংলাদেশ তার জাতীয় উন্নয়নের অগ্রাধিকারগুলোকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে সচেষ্ট রয়েছে।


