নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগ বাড়ানো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি–এমনটাই মনে করছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
সংস্থাটির মতে, নতুন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগে স্থবিরতা কাটানো।
শনিবার ঢাকার ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০২৫-২৬: নির্বাচনী বাঁকে বহুমাত্রিক ঝুঁকি’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এসব কথা তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং গবেষণা ফেলো খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমসহ সংস্থাটির অন্যান্য গবেষকেরা।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘বর্তমানে দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি অত্যন্ত দুর্বল। উচ্চ সুদহার, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আস্থার সংকটের কারণে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছে না। এর ফলে কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে এবং অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘বিনিয়োগ না বাড়লে বৈষম্য ও সামাজিক অস্থিরতা আরও গভীর হবে।’
তিনি উল্লেখ করেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে, বিশেষ করে তরুণদের জন্য। বাজারে পর্যাপ্ত চাকরি না থাকায় সরকারি চাকরির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে, যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কোটা-সংক্রান্ত জটিলতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি। এসব মিলিয়ে মানুষের জীবনে তীব্র অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে।’
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তরুণ জনগোষ্ঠী। দেশের মানুষের গড় বয়স মাত্র ২৬-২৭ বছর। এই তরুণদের দক্ষতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে কাজে লাগাতে পারলে অর্থনীতিতে গতি ফেরানো সম্ভব।’
প্রযুক্তিনির্ভর পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও তরুণদের সক্ষমতা সবচেয়ে বেশি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অর্থনৈতিক চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান, গত এক দশকের মধ্যে এডিপি বাস্তবায়নের হার বর্তমানে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ ঐতিহাসিকভাবে নিচে নেমেছে, একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগও কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ ও ভোগান্তিকর অবস্থায় রয়েছে।’
ব্যাংক খাত প্রসঙ্গে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন,‘ অন্তর্বর্তী সরকার যে সংস্কার উদ্যোগ নিয়েছে, তা নির্বাচিত সরকারকেও অব্যাহত রাখতে হবে। প্রয়োজনে দুর্বল ব্যাংক একীভূত করা বা বন্ধ করার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও সুস্পষ্ট নীতিগত অবস্থান জরুরি।’
রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিয়ে তিনি বলেন, ‘কর আদায় বাড়াতে নতুন পথ খুঁজতে হবে এবং করদাতাদের উৎসাহিত করতে হবে।’
অপ্রয়োজনীয় কর ছাড় প্রত্যাহার, অর্থপাচার রোধ, প্রকল্প ব্যয়ের কঠোর নজরদারি এবং ব্যাংকনির্ভর ঋণ গ্রহণে সংযত নীতি অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
মূল্যস্ফীতি নিয়ে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘এটি এখন কাঠামোগত সমস্যায় রূপ নিয়েছে। শুধু সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা সংস্কার, মজুতদারি রোধ, পরিবহন ও সংরক্ষণ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে সময়মতো আমদানির সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
খাদ্য নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি। ব্যাংক খাত সংস্কার ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন।
ঋণখেলাপি কমাতে রাজনৈতিক প্রভাব হ্রাস, ব্যাংক রেজুলেশন আইন কার্যকর, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং ব্যাংক কোম্পানি আইনের যথাযথ প্রয়োগের ওপর জোর দেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক।
নির্বাচন প্রসঙ্গে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘সিপিডি একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায়। নির্বাচনে অর্থের অপব্যবহার ও সহিংসতা যেন না হয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে মানুষ নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে।’
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘দেশি ও বিদেশি ঋণের চাপ ক্রমেই বাড়ছে এবং জাতীয় বাজেটে ঋণের সুদ পরিশোধ একটি বড় খাতে পরিণত হয়েছে।’
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
সিপিডির মতে, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে নীতির ধারাবাহিকতা, সুশাসন এবং সাহসী সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা গেলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে আনতে পারলেই অর্থনীতির স্থবিরতা কাটিয়ে নতুন গতি সঞ্চার সম্ভব হবে।


