ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে টানা ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে পদ্মা-মেঘনায় ফিরেছেন জেলেরা। রুপালি ইলিশের আশায় চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনার প্রায় ৭০ কিলোমিটার নৌসীমানায় মাছ ধরতে নেমেছেন হাজারো জেলে। নদী থেকে ইলিশ, পাঙাশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ নিয়ে জেলেরা ফিরতে শুরু করায় প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে নদীতীরের মাছঘাট ও আড়তগুলোতে। তিন সপ্তাহের স্থবিরতা কাটিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন আড়তদার, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকেরা। তবে বাজারে এখনো কমেনি ইলিশের দাম। আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে বড় আকারের ইলিশ।
শুক্রবার সকাল ৭টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত চাঁদপুর সদর উপজেলার হরিণা মাছঘাটে গিয়ে দেখা যায়, জেলেদের মাছ আহরণ, বিক্রি ও কেনাবেচায় সরগরম পুরো ঘাট। বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকেই ইলিশ ধরতে পদ্মা-মেঘনায় নামতে শুরু করেন জেলেরা। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরতে থাকেন তারা। হরিণা ফেরিঘাটসংলগ্ন মাছঘাটে একের পর এক জেলেনৌকা ভিড়ছে। ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ নিয়ে আসছেন জেলেরা।
ঘাটটিতে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২০টি ইলিশের আড়ত রয়েছে। জেলেরা এসব আড়তে মাছের স্তূপ করে রাখার পর শুরু হয় দরদাম ও বেচাকেনা। এখানে মাছ সংরক্ষণের ব্যবস্থা তুলনামূলক কম। মূলত শহরের বাজারে বিক্রির জন্য খুচরা ব্যবসায়ী এবং বড় স্টেশন মাছ অবতরণ কেন্দ্রে সরবরাহের জন্য পাইকারি ব্যবসায়ীরা এখান থেকে তাজা ইলিশ কিনে নিয়ে যান।
ঘাটসংলগ্ন গোবিন্দপুর গ্রামের জেলে লিটন তপাদার বলেন, রাতে নদীতে নেমে ভোরে ঘাটে এসে ১২ হাজার টাকার ইলিশ বিক্রি করেছেন। এভাবে মাছ পাওয়া গেলে কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হবে। আগামী দিনগুলোতেও ভালো মাছ পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন তিনি।
আরেক জেলে আবুল কালাম খান বলেন, সাতজন মিলে মধ্যরাতে নদীতে নেমেছিলেন। তাদের আহরণ করা মাছ ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবারও নদীতে মাছ ধরতে যাবেন। তবে কয়েক দিন পর ইলিশের প্রাপ্যতা কমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
ঘাটের আড়তদার জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ইলিশের চাহিদা বেশি থাকায় দাম কমার সম্ভাবনা কম। বর্তমানে এক কেজি ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম কেজিপ্রতি ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। আর ২০০ থেকে ৩০০ গ্রাম ওজনের ছোট ইলিশ প্রতি হালি ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তিনি জানান, ইলিশের পাশাপাশি কিছু জেলে পাঙাশও পাচ্ছেন। বড় আকারের পাঙাশ প্রতি কেজি ১ হাজার ২০০ টাকা এবং ছোট আকারের পাঙাশ ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ইলিশের সরবরাহ বাড়লে দাম কিছুটা কমতে পারে।
আড়তদার ইব্রাহীম মিয়া বলেন, নিষেধাজ্ঞা শেষে ঘাটে বড় আকারের ইলিশ বেশি আসছে। তবে ছোট আকারের ইলিশের পরিমাণ খুবই কম। ইলিশ তুলনামূলক কম পাওয়া গেলেও পাঙাশ ধরা পড়ায় জেলেদের লোকসান কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে নদীতে ইলিশের প্রাচুর্য আগের মতো নেই বলে মনে করছেন প্রবীণ মাছ ব্যবসায়ীরা। হরিণা মাছঘাটের প্রবীণ ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম সৈয়াল বলেন, এ সময়ে নদীতে ইলিশে ভরপুর থাকার কথা। কিন্তু অভিযান চালিয়েও প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। এক শ্রেণির জেলে মা ইলিশ শিকার করায় ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চাঁদপুর সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক বলেন, জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষায় সরকারের দুটি অভিযান কঠোরভাবে পরিচালিত হওয়ায় জেলেরা এর সুফল পেতে শুরু করেছেন। ইলিশের পাশাপাশি পাঙাশও ধরা পড়ছে।


