ভোরের চা পান শেষ করে একসঙ্গে কাজে বেরিয়েছিলেন নির্মাণশ্রমিক দম্পতি খাদিজা বেগম ও বদরুজ্জামান। সিলেটের দক্ষিণ সুরমার তেতলীতে পৌঁছানো মাত্রই তাদের বহনকারী পিকআপকে ধাক্কা দেয় একটি ট্রাক। সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তে স্বামী বদরুজ্জামান নিজের প্রাণের তোয়াক্কা না করে পাশে বসা স্ত্রীকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেন। বেঁচে যান খাদিজা, কিন্তু ফেরা হয়নি বদরুজ্জামানের। এখন হাসপাতালে নির্বাক হয়ে শুয়ে থাকা খাদিজার চোখে শুধু সেই শেষ দৃশ্য। আর অশ্রুতে ভাসছে তিন সন্তানের ভবিষ্যৎ।
খাদিজার চেয়েও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মুক্তিখোলা গ্রামের আব্দুল গফফার ও শামসুন্নাহার দম্পতি। তিন বছর আগে কুকুরের কামড়ে তাদের বড় সন্তানের মৃত্যু হয়েছে। রোববার সড়ক দুর্ঘটনায় তাদের ছোট দুই সন্তান আজির উদ্দিন এবং আমির উদ্দিনও প্রাণ হারিয়েছেন। দুই ছেলে হারানোর সংবাদ পেয়ে জ্ঞান হারিয়ে দুজনেই উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
আজির উদ্দিন, আমির উদ্দিন ও বদরুজ্জামানের মতো আরও ৫ জন সিলেটের দক্ষিণ সুরমার তেতলী নামক স্থানে পিকআপ ও ট্রাকের সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন। নিহত আটজনই নির্মাণ শ্রমিক। রোববার ভোরে সিলেট থেকে সুনামগঞ্জ যাওয়ার পথে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন, সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া গ্রামের মৃত ফখরুল আলীর ছেলে মো. সুরুজ আলী (৬০), একই উপজেলার সেঁততি গ্রামের বসির মিয়ার মেয়ে মোছা. মুন্নি (২৬), ভাটিপাড়া নুরনগর এলাকার মৃত নূর সালামের ছেলে ফরিদুল (৩৫), ধর্মপাশা উপজেলার সরিবা গ্রামের ইদ্রিস মিয়ার স্ত্রী নার্গিস (৪৫), সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পুটামারা এলাকার সুরত আলীর ছেলে মো. বদরুল জামান (৪০) এবং একই উপজেলার শিবপুর গ্রামের কুটির বিশ্বাসের ছেলে পাণ্ডব বিশ্বাস (২০) এবং সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মুক্তিখোলা গ্রামের আব্দুল গফফারের ছেলে আজির উদ্দিন ও তার ভাই আমির উদ্দিন।
এ দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই ৪ জন নিহত হন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ৪ জন মারা যান। এতে আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৭ জন।
সিলেটের সড়ক দুর্ঘটনায় নির্মাণ শ্রমিকদের মুত্যুর মিছিলে আজির উদ্দিন ও আমির উদ্দিনদের মতো আরও অনেক শ্রমিক যোগ হচ্ছে। ২০২৩ সালে একইভাবে ভোরে কাজে যাওয়ার পথে সিলেটের দক্ষিণসুরমা উপজেলার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নাজির বাজারে ট্রাকের সঙ্গে পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষে নারীসহ ১৪ শ্রমিক নিহত হন। এ সময় আহত হন আরও অন্তত ১৬ জন।
২০২৩ সালের হতাহত সকলেই ছিলেন একটি পিকআপে। রোববারের দুর্ঘটনায় হতাহতরাও একটি পিকআপে ছিলেন।
নির্মাণ শ্রমিকদের বহনকারী গাড়ি দুর্ঘটনা শিকার হলে প্রাণহানির নেপথ্যে রয়েছে একই গাড়িতে ভারি মেশিন ও মানুষ বহন। রোববার নির্মাণশ্রমিক দম্পতি খাদিজা বেগম ও বদরুজ্জামান দুজন দুর্ঘটনার শিকার হলেও ঢালাই মেশিনের নিচে চাপা পড়ে যাওয়ায় বদরুজ্জামানের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে তার স্বজনরা।
ধারণা করা হচ্ছে ভারি ঢালাই মেশিনের কারণেই হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে। এর আগে ২০২৩ সালের ঘটনায়ও হতাহতের সংখ্যা বেশি থাকার নেপথ্যে ছিল পিকআপে থাকা ঢালাই মেশিন।
নির্মাণ শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিলেটে অন্তত ৬-৭ হাজার নির্মাণ শ্রমিক রয়েছেন। যারা প্রতিদিনই সিলেট থেকে বিভিন্ন স্থানে গিয়ে কাজ করেন। প্রতিদিন ভোরে নির্মাণ শ্রমিকদের অন্তত ৪০ থেকে ৫০টি দল সিলেটের বিভিন্ন স্থানে যান। দিনভর কাজ শেষে আবার রাতেই ফিরে আসেন তারা। প্রতিটি দলে অন্তত ১৫-২০ জন শ্রমিক থাকেন। নির্মাণ শ্রমিকদের মধ্যে নারীদের সংখ্যা অন্তত ৫ শতাংশ।
শ্রমিকদের দাবি, তাদের কাজে ঝুঁকি নেই। কিন্তু বড় ঝুঁকি যাতায়াতে। কারণ খরচ কমাতে একটি পিকআপে শ্রমিক ও ঢালাই মেশিন সবকিছুই পাঠান ঠিকাদার। যার কারণে একটি পিকআপে ঢালাই মেশিনের আশে-পাশে শ্রমিকরা বাদুড়ের মতো ঝুলে ঝুঁকি নিয়ে গন্তব্যে যান। এতে করে দুর্ঘটনার শিকার হলে হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যায়। মুত্যুর সংখ্যাও থাকে বেশি।

আম্বরখানা ঢালাই শ্রমিক সমবায় সমিতির সভাপতি মো. পলাশ আহমদ বলেন, ‘২০২৩ সালের ঘটনার পর আমরা নিয়ম করেছিলাম একটি গাড়িতে মালামাল যাবে। আর পৃথক আরেকটি গাড়িতে করে যাবে শ্রমিক। এই নিয়ম যে মানবে না তাদেরকে জরিমানা দিতে হবে। কিন্তু সবাইকে এটা মানাতে পারিনি। আমরা পাহাড়া দিয়েও এটা ঠেকাতে পারি না।’
তিনি বলেন, গাড়িতে ঢালাই কাজের ব্যবহৃত মেশিন থাকায় শ্রমিকরা ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করেন। এজন্য দুর্ঘটনা ঘটলে হতাহতের সংখ্যাও বেশি থাকে।
সিলেট জেলা পুলিশ সুপার চৌধুরী মো. যাবের সাদেক বলেন, ‘এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এভাবে ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করলে দুর্ঘটনা ঘটলে হতাহতের সংখ্যা বেশি হবে। এতো ভারি মেশিনের সঙ্গে শ্রমিকদের যাতায়াত কোনোভাবেই কাম্য না। দ্রুত এ বিষয়ে আমরা বসে একটা সিদ্ধান্ত নেবো।’
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) মো. মনজুরুল আলম বলেন, সংঘর্ষে ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। দুর্ঘটনায় আরও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
স্ত্রীকে বাঁচিয়ে না ফেরার দেশে স্বামী, হাসপাতালে নির্বাক খাদিজা
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দক্ষিণ সুরমার তেতলীবাজার এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় স্বামীকে হারিয়ে হাসপাতালে নির্বাক হয়ে শুয়ে আছেন ২৮ বছর বয়সী খাদিজা বেগম। চিকিৎসকের নিষেধাজ্ঞায় কথা বলতে না পারলেও চোখের জলই যেন তার সব কথা বলে দিচ্ছে। পাশে বসে আছে তার তিন শিশু সন্তান।
রোববার ভোরে স্বামী বদরুজ্জামানকে নিয়ে কাজে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনার শিকার হন খাদিজা। এ ঘটনায় বদরুজ্জামানসহ আটজন নিহত হয়েছেন। গুরুতর আহত অবস্থায় খাদিজা বর্তমানে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি বিভাগে চিকিৎসাধীন।
খাদিজা জানান, দুর্ঘটনার মুহূর্তে ট্রাক পিকআপ ভ্যানকে আঘাত করলে তার স্বামী তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেন। এরপর আর কিছু মনে নেই তার। সেই ধাক্কাতেই প্রাণে বেঁচে যান খাদিজা, তবে স্বামীকে হারানোর শোক ভুলতে পারছেন না।
নিহতের স্বজনরা জানান, স্বামী-স্ত্রী দুজনেই নির্মাণ শ্রমিক ছিলেন এবং প্রতিদিনের মতো কাজের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলেন। চার সন্তানের জনক বদরুজ্জামান ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী।
নিহত বদরুজ্জামানের ছোটভাই আলাউর মিয়া বলেন, ভাই-ভাবী একসঙ্গে কাজ করতেন। আজকেও একসঙ্গে কাজে গিয়েছিলেন। তবে রাস্তায় সড়ক দুর্ঘটনায় ভাই মারা যান। শুনেছি পিকআপে ঢালাইয়ের কাজ করার মেশিনের নিচে চাপা পড়ে তিনি মারা গেছেন।
ভাগ্য বদলাতে সিলেটে আসা দুই ভাইয়ের প্রাণ গেল সড়কে
অভাব-অনটনের সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরাতে সিলেটে নির্মাণশ্রমিকের কাজ করতেন সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মুক্তিখোলা গ্রামের দুই ভাই আজির উদ্দিন ও আমির উদ্দিন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস-একই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন তারা দুজনই।
রোববার সকাল ৬টার দিকে সিলেটে কাঁঠালবোঝাই একটি ট্রাকের সঙ্গে শ্রমিক বহনকারী একটি পিকআপের সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই মারা যান এই দুই সহোদর।
দুই ছেলের মৃত্যুসংবাদ শুনে শোকে মুহ্যমান হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন তাদের বাবা আব্দুল গফফার ও মা শাছুর নাহার। বর্তমানে তারা উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্বজনরা বলছেন, দারিদ্র্যতা ঘোচাতে এবং বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে প্রায় এক বছর আগে সিলেটে পাড়ি জমান দুই ভাই। নগরের আম্বরখানা এলাকার লোহাড়পাড়া এলাকায় ভাড়া বাসায় থেকে নির্মাণশ্রমিকের কাজ করে পরিবারের ভরণপোষণ চালাতেন তারা। বড় ভাই আজির উদ্দিন অবিবাহিত ছিলেন। ছোট ভাই আমির উদ্দিনের পরিবারে রয়েছে দুই ছেলে ও এক মেয়ে। মূলত এই দুই ভাইয়ের উপার্জনেই চলত পুরো পরিবার।
পরিবারের দুর্ভাগ্য যেন পিছু ছাড়েনি। তিন বছর আগে তাদের বড় ভাই আলা উদ্দিন কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এবার দুর্ঘটনায় হারালেন আরও দুই সন্তানকে।
নিহতদের মামা সোহেল আহমদ সিলেট নগরীতে ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করেন। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ছুটে আসেন সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ভাগ্নে দুজনই খুব পরিশ্রমী ও শান্ত স্বভাবের ছিল। প্রতিদিনের মতো কাজের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিল, কিন্তু আর ঘরে ফেরা হলো না।’
তিনি আরও বলেন, ‘ওরা খুব গরিব ছিল। মায়ের ওষুধ কিনতেও অন্যের সাহায্য নিতে হতো। সংসারের ভাগ্য বদলাতে সিলেটে এসে কঠোর পরিশ্রম করছিল। দুই ভাই সব সময় একসঙ্গেই থাকতো। আজও একসঙ্গেই চলে গেল।’
সোহেল আহমদ জানান, কিছুদিন আগে তাদের মায়ের পায়ে অপারেশন করে রড বসানো হয়। সেই চিকিৎসার খরচ জোগাতেই হিমশিম খাচ্ছিল পরিবারটি। এর মধ্যেই এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা তাদের পুরো পরিবারকে নিঃস্ব করে দিল।


